Street dogs; রাস্তার কুকুর। মানে রাস্তায় যেসব কুকুরেরা 'বিচরণ' করে। সাধারণ কথায় দেশী বা নেড়ি কুকুর। কেউ কেউ আবার বিদ্রূপ করে এদেরকে 'ঘি-য়ে ভাজা', 'লোম ওঠা', 'ঘা ওয়ালা' ইত্যাদি এসবও বলে থাকে। স্বভাবে এরা একই সাথে প্রচন্ড অহংকারী ও নিরহংকারী দুই প্রকারেরই হয়ে থাকে। এছাড়াও এদের আরেকটি স্বভাব হল রাস্তা-ঘাট ফাঁকা পেলেই এরা সেখানে জেঁকে বসে ও নিজেদের মধ্যে অল্প-অল্প করে জায়গা ভাগ করে নিয়ে সেখানেই নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে 'রাজত্ব' চালায়। যাকে বলে একচ্ছত্র আধিপত্য। নিজেদের সেইসব ফিকটিশিয়াস রাজ্যের সীমায় বাইরের কেউ এসে পড়লে (মানুষ বা অন্য কোন প্রাণী) তার আর রক্ষা নেই; দলবল নিয়ে এইসা তাড়া দেবে যে 'অনুপ্রবেশকারী'দের তাতে একটা মিনি হার্ট অ্যাটাক আসতে বাধ্য। তবে এই ধরনের কুকুরদের স্বভাবের একটা ভালো দিক হ'ল, খুব বড়সড় কোন বেয়াদবি না করলে এরা চট করে কাউকে কামড়ায়না। তবে লোকশূন্য ফাঁকা রাস্তা-ঘাটে এদের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়ে যায় যে কেউ মোটর গাড়িতে, সাইকেলে বা হেঁটে যেতে বড় একটা রাজী হয়না। কারণ, না কামড়ালেও জন্মগত অধিকার সূত্রে তাড়া তারা করবেই!
অন্যসব শহরের কথা ঠিক বলতে পারবোনা তবে আমার শিলিগুড়ির এই সমস্ত street dog গুলো একই সাথে প্রচন্ড খেপচুরিয়াস ও ডেঞ্জারাস! এহেন স্বভাবের কুকুরদের সাথে যদি আশপাশের রাজ্য, মানে গলি থেকে আরো কিছু কুকুর সঙ্গত দিতে চলে আসে তাহলে আর দেখতে হবেনা, ডাইনোসরের ঠাকুরদাদাকেও চোখে সর্ষেফুল দেখিয়ে ছেড়ে দেবে বলেই আমার বিশ্বাস। একচুয়ালি শিলিগুড়ির রাস্তার লালু, ভুলু, কালু, বাদশাদের উপর আমার আস্থা বরাবরই নিজের থেকেও বেশী!
কুকুরদের সাইকোলজি স্টাডি করে তাদের থেকে ধাওয়া খাওয়ার চান্সের বিষয়ে আমি কয়েকটি সিদ্ধান্তে এসেছি (তবে সিদ্ধান্তগুলো আমার মৌলিক আবিষ্কার নাও হতে পারে, মানে অন্য কেউ আমার আগেই একই সিদ্ধান্তে চলে আসতেই পারে), " 'অনুপ্রবেশকারীর' গতি, কুকুরের ধাওয়া করার প্রবনতা ও কুকুরের ধাওয়া করার বেগ একে অপরের সমানুপাতিক।" উদাহরণ দিয়ে ভেঙে বললে, অনুপ্রবেশকারী যদি মোটরগাড়িতে থাকে তাহলে গতিবেগ বেশী হওয়ার জন্য কুকুরের থেকে তার ধাওয়া খাওয়ার চান্স সবচাইতে বেশী হয়; যদি মাঝারি গতির কোন সাইকেলে থাকে তাহলে সেই চান্সটা একটু কম আর অনুপ্রবেশকারী যদি প্যাডেস্ট্রিয়ান হয় তাহলে সেই ক্ষেত্রে তার ধাওয়া খাওয়ার চান্স সবচাইতে কম। আবার, পথিকদের পোশাক -আশাক বা বেশ-ভূষাও ধাওয়া করার এই প্রসেসটাতে 'অনুঘটক' হিসাবে কাজ করে। একইভাবে এই প্রণালিতে ব্যাস্তানুপাতিক ভাবে লক্ষ্য করা যায় ট্রেসপাসার্সদের সংখ্যা ও রাস্তায় উপস্থিত কুকুরদের সংখ্যা। অর্থাৎ, অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা যদি কুকুরদের সংখ্যার থেকে বেশী হয় তাহলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে কুকুরেরা হামলা-টামলা করতে বিশেষ আগ্রহ দেখায়না কিন্তু সংখ্যার ব্যাপারটা যদি উল্টো হয় তাহলে 'ইয়ে সির্ফ আপুনকা ইলাকা হ্যায়' গোছের একটা মনোভাব নিয়ে কুকুরেরা পথিকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেই পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে রাস্তার এই সব কুকুরের সামনে কোন বেচাল চাললে, দৌড়লে বা এদের লক্ষ্য করে ঢিল-টিল ছুঁড়লে (এই শেষ কাজটা যদিও কারো করা উচিতও না) এদের মনের ভিতরকার হিরোয়িক এনটাইটি জেগে উঠে আপনাকে বিপদে ফেলে দিতে পারে। এই ব্যাপারটার সাথে স্যার আইজ্যাক নিউটনের গতিসূত্রের দু'টো সূত্রের খুব মিল পাই। স্যার নিউটন বলেছিলেন, 'বাইরের থেকে বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির আর সচল বস্তু চিরকাল সচল অবস্থায় থাকে।' যেমন, জৈষ্ঠ্যের কোন শেষ দুপুরে কোন বাড়ি বা গাছের ছাওয়ায় নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে থাকা একটা কুকুরের গায়ে ঢিল না ছোঁড়া পর্যন্ত তার ভিতরকার রাগ তাকে সচল করেনা। পক্ষান্তরে, স্যার নিউটন যখন আবার বললেন, 'প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া থাকে ', তখনও ব্যাপারটা সহজেই মিলে গেল কারণ ঢিলটা না ছোঁড়া পর্যন্ত এক্ষেত্রে কুকুরটা ধাওয়া করে আসতনা। কারণ ছাড়া কার্য হয়না। আর এক্ষেত্রে 'কারণ'টাতো পথিক নিজেই দিয়ে দিয়েছে, এখন 'কার্যের' ঠ্যালাটাও নিজেই সামলাক!
সত্যি বলতে এইসব কারণেই কুকুরদের আমি ভীষণ ভয় পাই, তাদের সাথে বিশেষ দেখা-সাক্ষাত তো করতে চাইনা কিন্তু কপালফেরে দেখা হয়ে গেলে সবসময় তাদের মন জুগিয়ে চলার চেষ্টা করি। পিতৃদত্ব প্রাণ আমার একটা বই দু'টো তো নেই, বেকার কায়দা দেখিয়ে কী লাভ?
তবে সব নিয়মেরই ব্যাতিক্রম থাকে। এই নিয়মগুলোরও আছে। সব সময়েই যে কুকুরেরা 'গোপাল বড় সুবোধ বালক'-এর স্টাইলে এইসব নিয়ম মেনে চলবে তার কোন গ্যারান্টি নেই। কোয়ান্টাম ফিজিক্স যেমন অবাধ্য ছেলের মত ক্লাসিকাল ফিজিক্সের কোন নিয়ম না মেনে সমস্ত হিসাব-কেতাব উল্টে দেয় তেমনই কুকুরেরাও যে কোন মুহুর্তে এই সব নিয়ম ভেঙে দিতেই পারে। এতে তারা নিজেরা যেমন শান্তি পায় ঠিক তেমনই বাকি প্রাণীজগতকে অশান্তির মুখে ঠেলে দেয়। হয়ত স্রেফ আনন্দ লাভ করে মজা পাবার জন্যই কুকুরেরা এইরকম ধাওয়া-টাওয়া দিয়ে থাকে, মানে যাকে বলে, জাস্ট ফর হ্যাভিং ফান। কিন্তু তাদের ফানের ঠ্যালায় আমাদের জান যে কয়লা হয়ে যায়, সেটা এদের কে বোঝাবে!
এইবছরের গোড়ার দিকে আমাদের ভারতীয়দের সাথে যখনও পর্যন্ত করোনা ভাইরাস নামটির পরিচয় হয়নি তখনও রাস্তা-ঘাটে লোকজনের স্বাভাবিক ভীড়-ভাট্টা লেগেই থাকত, এতে করে কুকুরগুলো বেশীরভাগ সময়েই তেমন সুবিধা করতে পারতনা। কিন্তু গত মার্চ মাসের শেষের দিকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমন রোখার জন্য সরকার বাহাদুর পুরো দেশে লকডাউনের ঘোষনা করে দিলেন। লকডাউনের অর্থ, স্কুল-কলেজ-অফিস-কাছারি-বাজার-ঘাট-দোকানপাট-বাস-রেল-প্লেন সব বন্ধ; কেউ বাড়ি থেকে বেড়াতেও পারবেনা রাস্তা-টাস্তা একদম শুনশান; 'না বান্দা না বান্দে কি জাত' (সলমন খানের 'গর্ব' ছবির ফেমাস ডায়ালগ। )
মজার কথা, এর আগে লক আর ডাউন শব্দ দু'টা আলাদা আলাদা ভাবে শুনতেই অভ্যস্ত ছিলাম আর তখন এদের ব্যবহারগুলোও অন্যরকম ছিল; কিন্তু এই দু'টা শব্দকে যে মার্জ করে লকডাউন বলে কোন শব্দ হতে পারে আর তার ব্যবহারিক প্রয়োগ এতটা ব্যাপক হতে পারে সেইবিষয়ে কোনো ধারনাই ছিলনা আমার! একই কথা 'সোশ্যাল -ডিসট্যান্সিং'-কথাটার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এরকম আরো অনেক ইংরেজি শব্দ আছে যেগুলো করোনা ভাইরাস মানবজাতিকে অ্যাটাক করার পরই জেনেছি। সেই দিক দিয়ে দেখলে স্যানিটাইজেশন শেখানোর সাথে সাথে করোনা ভাইরাস আমাদের ইংরেজির স্টক অব ওয়ার্ডও বেশ খানিকটা বাড়াতে সাহায্য করেছে।
যাইহোক, রাস্তা-ঘাটে লোকজন নেই আর এরকম অবস্থার সুযোগ নিয়ে শিলিগুড়ির বিভিন্ন রাস্তার কুকুরেরা যে নিজেদের সাম্রাজ্য তৈরী করতে সক্রিয় হয়ে উঠবে এতে আর কী সন্দেহ থাকতে পারে! গত মার্চ মাসে লকডাউনের পর থেকে পুরো ছবিটাই তাই সেইমত পাল্টে গেল। স্কুল-কলেজ, অফিস-বাজার সব বন্ধ হল। শুনশান রাস্তা-ঘাটে এখন শুরু হল কুকুরদের রাজত্ব। মানুষদের জন্য কাজ কমে গিয়ে ঠেকল মাত্র দু'টাতে, সারাদিন শুধু ঘরে বসে থাকা আর ঘন্টায় ঘন্টায় সাবান দিয়ে হাত ধোওয়া। আমিও মুখ বুঁজে ভালো ছেলের মত বাড়িতে থাকতে থাকতে হাঁফিয়ে উঠে মাঝেমাঝে সন্ধ্যার সময় বাড়ির সামনের মোড়টাতে দাঁড়িয়ে থাকতাম। সেইসময় দেখতাম লকডাউন যাতে ভালোভাবে পালিত হয় সেইজন্য ইলেকট্রিসিটি বোর্ড রোড লাইট গুলোকেও অফ্ করে রাখত! এতে আলো না থাকার কারণে রাস্তার অন্ধকারটা স্বাভাবিকভাবেই আরেক পোচ গাঢ় হয়ে যেত (ভুত-প্রেতদের পক্ষে বেশ আইডিয়াল একটা এনভায়রোনমেন্ট)। চারদিকে অন্ধকারটা পেয়ে শিলিগুড়ির রাস্তার কুকুরগুলো যে তাদের ফিকটিশিয়াস সেই রাজ্য গুলোর নিরপত্তার ব্যাপারে আরো কনশাস্ হয়ে উঠবে এ আর নতুন কথা কী? তবে ঐ সময়টাতে রাস্তায় সেরকম বেড়োতামনা বলে আমাকে কখনও সেইসব কুকুরদের মুখোমুখি পড়তে হয়নি; যদিও রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বা আমার ঘরের বিছানায় বসেই কখনও কখনও পাশের গলিটার থেকে একসঙ্গে ছয়-সাতটা কুকুরের রাগ-বিস্ময় ও বিরক্তি মেশানো ঘেউ ঘেউ শব্দে প্রশ্ন ও তার সাথেই কোন পথচারীর 'সকরুণ মর্মস্পর্শি আর্তনাদ' ও হুটোপুটির শব্দ আমাকে, যাকে বলে, 'মর্মাহত' করে তুলত। লকডাউন চলাকালীন এই রকম বেশ কিছু ঘটনাও ঘটতে দেখেছি।
একদিন দুপুরের দিকে খাওয়া-দাওয়ার পর ছাদে পায়চারী করছি এমন সময় দেখি আমাদের বাড়ির পেছনের গলিটা দিয়ে ঝরঝরে একটা অ্যাক্টিভাই বোধহয়, প্রায় ৬০ কিমি প্রতি ঘন্টার বেগে ডানদিক থেকে বাঁ দিকে বেড়িয়ে গেল আর ঠিক তার পেছন পেছনই ছুটে গেল আট-নয়টা কুকুর, তাদের গতিবেগও প্রায় ২০-২৫ কিমি প্রতি ঘন্টা। বাঁদিকে আর কিছুটা এগোলেই সামনে বড় রাস্তার মোড়, তাই কয়েক মুহুর্তের জন্য মনে হ'ল একটা বিচ্ছিরি অ্যাক্সিডেন্টের ব্যাপার না হয়ে যায়। তবে এই ধরনের কুকুরেরা খুব বেশীদূর পর্যন্ত ধাওয়া করেনা এটা জানতাম। এদের একটা নির্দিষ্ট গন্ডী থাকে যার বাইরে এরা সচরাচর যায়না। সেই অ্যাক্টিভা আর তার আরোহীটার সেদিন শেষমেশ কী হয়েছিল জানিনা। কারণ আমাদের ছাদের সামনের বাঁ দিকটায় বেশ কিছু বাড়ি থাকায় আংশিক ঘটনাটা সেগুলোর আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছিল। তাই সবটা দেখতে পাইনি। তবে মনে হয়না বাড়াবাড়ি কিছু হয়েছিল বলে, কারণ কিছু হ'লে সেটা জানতে পারতাম।
আরেকদিনের কথা, সন্ধ্যাবেলায় আমি বাড়ির সামনের সেই মোড়টাতে দাঁড়িয়ে আছি হঠাৎ একটা বিটকেল 'গোঁওও' মতন যান্ত্রিক চিৎকারে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি ডানদিকে একটু দূর থেকে প্রচন্ড গতিতে একটা বাইক ছুটে আসছে। একটু কাছে আসতে বুঝতে পারলাম সেটা একটা কে.টি.এম বাইক যার সাইলেন্সলটা খোলা(এটাই সেই বিকট 'গোঁওও' আওয়াজটার উৎস)। বাইকে যে ছেলেটি বসে আছে সে নিতান্তই ফড়ে ধরনের। তার চেহারাটাও বেশ ইন্টারেস্টিং; কিশমিশকে দু'সপ্তাহ রোদে শুকালে সেটা যেরকম দেখতে হয় সেরকম চেহারা, মাথার চুল বেশ বাহারি করে ছাঁটা তবে আলো পড়ে আসা সেই সন্ধ্যাবেলাতেও চোখের হলুদ রঙের রোদ চশমাটার কী ইউসেজ ছিল সেটা যদিও বুঝতে পারলামনা! পরনে সবুজ রঙের একটা ফুলহাতা টি-শার্টের নীচে ডেনিম ব্লু রঙের হালফ্যাশনের ছেঁড়া জিন্সের প্যান্ট (কিছু লোক যে স্বেচ্ছায় ছেঁড়া জামাকাপড় পরে যে কী আনন্দ পায় তা বুঝিনা) , পায়ে লাল রঙের একটা স্পোর্টিং শু। সব মিলিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ছেলেটার বেশ একটা রঙচঙে অ্যাপেয়ারেন্স; বাইকারোহীদের এই রকম চোখে লাগা রঙিন উপস্থিতিতে কুকুরদের যে আপত্তি থাকতেই পারে এটা ছেলেটার আগেই বোঝা উচিত ছিল। আমি যখন ছেলেটাকে অবাক বিস্ময়ে দেখছি তখন সে বাইকসমেত আমার আরো কিছুটা কাছে চলে এসেছে; আর তাতেই তার প্রচন্ড গতির কারণটা বুঝতে পারলাম। দশ-বারোটা কুকুর এর পিছনেও ধাওয়া করেছে।
এদিকে কুকুরদের সঙ্গে আমার কেমিস্ট্রিটাতো কোনদিনই সেরকম জমেনা, তাই কুকুরগুলোর সংখ্যা আর ওদের 'আগ্রাসী মনোভাব' দেখে আমার পা-বুক কাঁপা শুরু হয়ে গেল! একবারের জন্য খুব ইচ্ছা হচ্ছিল পাশের বাড়ির গেটটা খুলে ভিতরে ঢুকে যাই; একই পাড়ার লোক যখন, তখন হয়ত সেরকম কিছু বলবেনা, বিশেষ করে এরকম সংকটের মুহুর্তে। কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ে গেল রিসেন্টলি ওই বাড়িতেও ম্যাস্টিফ না কী জানি প্রজাতির একটা কুকুরের আমদানি হয়েছে। মানে, বাড়ির মালিক পোষার জন্য নিয়ে এসেছে আরকি! কথাটা মনে পড়তেই নিজের মনোবাসনাটাকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বাতিল করে দিয়ে নির্বিকারভাবে মোড়েই দাঁড়িয়ে রইলাম। তবে নিজের ইচ্ছায় নয়। আমার যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গুলোতে একটু আগে কাঁপুনি মতন ধরেছিল কুকুরের দলকে সামনে আসতে দেখে সেগুলো এখন অসাড় হতে শুরু করেছে। তাই খুবএকটা ইচ্ছা না থাকা সত্বেও দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছিলাম।
এইসময়েই বোধহয়, বাইকটার স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেল আর সেটার স্পীড কমতে কমতে একটা ঝটকা মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল (হয়ত বাইকের কোন টেকনিক্যাল গোলোযোগ হয়ে থাকবে, তবে সঠিকটা বলতে পারবোনা।)। বাইকটা থেমে যাওয়ার পরেই আশ্চর্য হয়ে দেখলাম কুকুরগুলোও সেটার পেছনে ছোটা বন্ধ করে দিল। যেন, থেমে যাওয়া বাইকের পেছনে ছুটে এখন তারা আর নিজেদের এনার্জি নষ্ট করতে চায়না। এই ব্যাপারটাকে কুকুরদের একটা 'সাপোর্টিভ অ্যাক্ট' টাইপের কিছু বললেও খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবেনা। 'তুমি ছুটলেই আমরাও ছুটব, তুমি ছোটা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়লে আমরাও দাঁড়িয়ে যাব' তাদের ভাবটা যেন এমন; অস্বীকার করবনা, ডগ সাইকোলজির এই ব্যাপারটা আমারও খুব ভালো লাগে।
হ্যাংলা বাঘের হাত থেকে আচমকা ছাড়া পেলে হরিণ-টরিনদের মুখের যেরকম অভিব্যক্তি হয় (থ্যাংস টু ডিসকভারি আর ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক টিভি চ্যানেল) তার সাথে, সাধু বাংলায় যাকে বলে 'কিংকর্তব্যবিমূঢ়', সেই টাইপের একটা ভাব মেশানো মুখের এক্সপ্রেশান নিয়ে ফড়ে ছেলেটি বাইক থেকে নেমে ভগবানকে ধন্যবাদ জানালো বোধহয়। তারপর আবার বাইকে উঠে বসে চার-পাঁচ বারের চেষ্টায় সেটাকে স্টার্ট করে মাথা ঘুরিয়ে পিছন দিকটা একবার দেখে নিয়ে বেড়িয়ে গেল।
আমি ভেবেছিলাম কুকুরগুলো এবার আমাকে নিয়ে না পড়ে! কিন্তু না, খুবই তাচ্ছিল্যের সাথে আমাকে উপেক্ষা করে যেই দিক দিয়ে তারা এসেছিল সেইদিকেই আবার চলে গেল। বলতে নেই, আমিও এতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। হাত-পায়ের অসাড়তটাও কাটল!
এর মাস চারেক পরের একটি ঘটনা থেকে বুঝলাম কুকুরের এই ভয়টা মাঝে মধ্যে আমার মেমরি বুস্টার হিসাবে কাজ করে আমার ভেতরকার উদ্ভাবনী শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। কুকুরদের সাথে এই ঘটনার পাত্র এবার আমি নিজে।
ঘটনাটা গত মাসের ২৯ তারিখের। লকডাউনের তখন একেবারে ইলেভেন্থ আওয়ার চলছে। রাস্তায় দু-চারজন লোককেও দেখা যাচ্ছে। আমি আমার দিদির বাড়ি যাব বলে পায়ে হেঁটেই বেড়িয়েছি। উদ্দেশ্য, জামাইবাবুর থেকে তার পাওয়ার ব্যাঙ্কটা নিয়ে আসা। কোন কাজে বাড়ির বাইরে যেতে হলে (অফিস বা অন্য কোথাও) কোভিড-১৯ এর করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে সেই মার্চ মাস থেকেই আমার সাধারণ পোশাকের সাথে অভিন্নভাবে আরোকয়েকটি পোশাক জুড়ে গেছে, যেমন মুখে মুখোশ (মাস্ক), হাতে প্রায় কনুই পর্যন্ত ঢাকা দস্তানা (গ্লাভস), মাথায় কান পর্যন্ত ঢাকা যায় এমন টুপি (যেগুলো সার্জিক্যাল অপারেশনের সময় ডাক্তারবাবুরা পড়ে), পায়ে বুট বা স্পোর্টিং শু (বাট নট স্যান্ডাল) যাই হোকনা কেন তার উপরে একটা প্লাস্টিকজাতীয় আবরণী, চোখের চশমাটা অবশ্য রিয়্যাল। এইসব পড়ে যে আমাকে ঋত্বিক রোশন বা টম ক্রুজের হ্যান্ডসাম দেখতে লাগে তা কিন্তু না। তবে ঐ যে কথায় বলেনা, নিজে বাঁচলে বাপের নাম- সেই ব্যাপার আর কি!
আমার এই অপারেশন থিয়েটার মার্কা বেশ-ভূষায় আর কারো আপত্তি না থাক কিন্তু কুকুরদের যে আপত্তি থাকতেই পারে সেটা অন্তত আমি কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারিনা। সেদিন আমি যে রাস্তা দিয়েই দিদির বাড়ির দিকে যাব বলে পা বাড়াচ্ছি সেই রাস্তাতেই দেখি দশ-বারোজন সড়ালে-নেড়ি টাইপের লালু-ভুলু-কালুরা শুয়ে-বসে আছে, পায়চারি করছে বা যেন আমাকে অভ্যর্ত্থনা জানানোর জন্য আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে; ছোটবেলা থেকেই 'কুকুরোফোবিয়া' (বলাইবাহুল্য এটা আমার নিজের বানানো শব্দ, ডিকশনারিগুলোতে পাওয়া যাবেনা)-য় ভুগতে থাকা আমার পক্ষে এটা খুবই অস্বস্তিকর একটা পরিস্থিতি। কোনরকম কুকুরকে আমি কখনই কোনো ভাবে বিরক্ত করাটা পছন্দ করিনা; আর এরকম দৃশ্যও আমার একদম ভালো লাগেনা। তবুও প্রতিটা গলিতে ঢুকেই আমার দু'চোখের 'সন্ধানী দৃষ্টি' সবার প্রথমেই এরকম দৃশ্য খুঁজে নিচ্ছে আর সাথেসাথেই কোন এক অদৃশ্য শক্তি যেন আমার পা দু'টোকে সেই গলি থেকে বার করে অন্য গলিতে নিয়ে গিয়ে ফেলছে! কুকুরদের ভয়ে আর তাদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে এভাবে একের পর এক রাস্তা, একের পর এক গলি বদল করে যাচ্ছি।
আমাদের বাড়ি থেকে দিদির শ্বসুড়বাড়ি যাওয়ার যে ছাব্বিশটা রাস্তা এর আগে চিনতাম তার প্রত্যেকটাতেই কুকুরদের অতন্দ্র পাহারা দেখে আরো অনেক ঘুরে ঘুরে আবিষ্কার বা উদ্ভাবন করলাম, ছাব্বিশটা নয়, আমাদের বাড়ি থেকে মোট আটচল্লিশটা রাস্তা দিয়ে দিদির শ্বসুড়বাড়ি যাওয়া যায়। সেই আটচল্লিশ নম্বর রাস্তাটার মোড়ের থেকে অল্প একটু দূরে চার-পাঁচটা কুকুর দেখলাম শুয়ে-বসে আছে আর তাদের মধ্যে দু'টি অপারেশন থিয়েটার মার্কা পোশাক পরা আমার দিকে চোখ-টোখ কুঁচকে খুবই বিরক্তির সাথে তাকিয়ে আছে। মিথ্যা বলবনা, তাদের সেই চোখ রাঙানো দেখে আমার বুকের ভিতরটা ভারী খালি-খালি লাগছিল। নিজের চোখটা নামিয়ে ভাবছিলাম ঐ রাস্তাটা দিয়ে আমি দিদির বাড়ির অনেকখানি সামনে চলে এসেছিলাম এখন যদি কুকুরগুলোর চোখ রাঙানোর জন্য এই রাস্তাটাও আমাকে আবার চেঞ্জ করতে হয় তাহলে ভারী মুশকিলে পড়ে যাব। এমন সময় একটা চাপা গড়গড়ানির আওয়াজ শুনে চোখ তুলে দেখি যেই দু'টো কুকুর একরাশ বিরক্তি নিয়ে এতক্ষণ আমার দিকে তাকিয়েছিল তাদেরই একজন আমাকে দেখে ভুকবার তাল করছে। সর্বনাশ! কুকুরের 'ঘেউ' সাংঘাতিক ছোঁয়াচে জিনিস। ইনি একবার ডেকে উঠলেই তার ডাকে সাড়া দিয়ে পুরো হাকিমপাড়ার সব কুকুরেরা ভুকতে ভুকতে আমাকে ভুক্তভোগী করে তোলার জন্য ছুটে আসবে! বাধ্য হয়ে একটানে মাথার টুপিটা খুলে ফেললাম, তাতে আমার বেশ-ভূষা খানিকটা হলেও স্বাভাবিক হ'ল আর এও বুঝলাম যে করোনা ভাইরাসের চেয়েও কুকুরের ভয়টাই এখনো আমার কাছে অগ্রাধিকার পায়! এইসময় বেচাল করলে আর রক্ষা নেই; মনকে যথাসম্ভব শান্ত করে বোঝাতে থাকলাম, এই তো আর কয়েক পা এগোলেই গন্তব্যে পৌঁছে যাব, এখন যদ্দুর সম্ভব স্বাভাবিকই থাকতে হবে। তাই করলাম, মাথার টুপিটাতো আগেই খুলে ফেলেছিলাম তার সাথে মুখে জোর করে একটা নির্বিকারভাব নিয়ে মোড়টা পেরিয়ে গলিতে ঢুকে পড়লাম (যদিও বুকের ভিতরটায় তখন শয়ে শয়ে দামামা বাজছে)।
আমাকে শান্ত দেখেই হোক বা অন্য কোন কারণেই হোক কুকুরমশাই তার গড়গড়ানিটাকে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে নিয়ে গেলেননা; চুপ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন। এই দৃশ্যটা দেখে এবার আমার মনে এমন একটা প্রগাড় শান্তির ভাব আসল, যেমনটা ছাত্রজীবনে কোন কোন ত্যাঁদড় ব্যালান্স শিট মিলিয়ে আসত। বাকি রাস্তাটুকুতে কুকুর -টুকুর কেউ নেই, এখন শান্তি করে শান্ত মতন হেঁটে যেতে পারবো।
দিদির বাড়ি থেকে কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে যখন ভাবছি যে আবার এই 'সারমেয়-শঙ্কুল' পথ গুলো দিয়ে আমাকে ফিরতে যখন হবেই তখন কীভাবে ফিরব তার একটা প্ল্যান ছকে নেওয়া দরকার তখনই বেশ খানিকটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই একটা সাইকেল রিক্সা পেয়ে গেলাম! 'ভাই রবীন্দ্রনগর যাব, কত ভাড়া নেবে?' উত্তরের 'চল্লিশ টাকা দেবেন' কথাটা অন্যসময়ে শুনলে ভাড়াটাই করতামনা একথা হলফ করে বলতে পারি। কিন্তু সেদিনের ব্যাপারটা একদম আলাদা ছিল। 'বেশ তাই চলো' বলে রিক্সায় উঠে বসে মনে মনে ভগবানকে একটা নমো ঠুকে বললাম 'ভগবান, কে বলে তুমি নেই?'
No comments:
Post a Comment
Feel free to give your opinion in comment. Your comment will visible after approval.