আর পাঁচটা শিশুর মত ছোটবেলায় আমিও ঠাকুরঘর (ভগবানের এই নামটা কোত্থেকে এল জানিনা) থেকে কলা-বাতাশা-সন্দেশ এসব 'চুরি' করে খেতাম। প্রসাদ হিসাবে খাওয়ার চেয়ে চুরি করে খাওয়ার মধ্যে যে কী শিশুসুলভ আনন্দ থাকে তা আজও বুঝতে পারিনি। এর জন্য আমার ঠাকুমার থেকে বকাও খেতাম প্রচন্ড। ঠাকুমা বলতেন- এভাবে চুরি করে খাওয়া অন্যায়, ওতে অধর্ম হয় আর ভগবান তাতে 'পাপ' (অভিশাপ) দেয়। আমি তো ভয়-টয় পেয়ে পরের তিন-চার দিন হয়ত ঠিক থাকতাম কিন্তু পঞ্চম দিনের দিন দেখা যেত ঠাকুরঘরে রাখা সন্দেশের প্যাকেট থেকে একটা সন্দেশ আবার আমার উদরস্থ হয়ে গেছে! তাই বলে ভগবানের উপর, অধর্মের উপর, পাপের উপর যে বিশ্বাস করতাম না তা কিন্তু নয়; তখন মনে মনে নিজেকে এই বলে সাহস সঞ্চয় করতাম যে, ওতগুলো সন্দেশের থেকে একটা নিলে 'ঠাকুর' কিছু বলবেনা। 'পাপ' দেবেনা। - হয়ত সেই বয়সে পাপ-পূণ্য বোধ মনের মধ্যে তৈরী হয়নি বলেই 'ঠাকুর'কে নিজের বন্ধুগোত্রের কেউ মনে করে খুবই সহজ ভাবে এমনটা করার সাহস পেয়ে যেতাম। বয়স বাড়লে ধীরে ধীরে আমার ভেতরে পাপ-পূণ্য বোধের ব্যাপারটা তৈরী হওয়ার সাথে সাথেই ঠাকুরঘর থেকে এই 'অকারণ চুরির প্রবৃত্তি'টাও উধাও হয়ে গেল।
যাইহোক, সন্ধ্যাবেলায় তুলশীতলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা, ঠাকুরঘরে ভগবানের সামনে ধূপ আরতি করা, একাদশীর ব্রত পালন করা, নিয়মিত বিভিন্ন পূজা-পাঠ করা তার সঙ্গে বিভিন্ন পূজা-পাঠের হাজারটা নিয়ম অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করা (যেগুলো থেকে আমরাও বাদ পরতামনা) , নিজে খাওয়ার আগে সেই খাবার পঞ্চদেবতাকে (নাগ, কূর্ম, দেবদত্ত, ধনঞ্জয়, কৃকরা) নিবেদন করে খাওয়া (পৈতা নেওয়ার পর এই নিয়মটা আমিও কিছুদিন follow করেছিলাম; যদিও কিছু কারণে আর কিছু অকারণে ব্যাপারটা continue করে যেতে পারিনি) ইত্যাদি এইসবই ঠাকুমার কাছে ছিল ধর্মের পরিভাষা। ঠাকুমা প্রায়ই বলতেন এগুলো ঠিকমতো পালন না করলে ভগবান 'কূপিত' হয়ে 'পাপ' দেবেন (যদিও পরে বুঝেছিলাম একে-ওকে ধরে ধরে পাপ বা অভিশাপ দেওয়া ছাড়াও ঠাকুর বা ভগবানের আরো অনেক গুরুতর কাজ থাকে)। এভাবে ছোটবেলা থেকেই আমার মধ্যে একটা ধারণা গেঁথে গেছিল যে ধর্ম মানে শুধুই চাল-কলা-নৈবেদ্য-ধূপ-দীপ-আরতি-ভগবান আর সর্বোপরি ঠাকুরঘর।
কিন্তু বড় হওয়ার পর যখন মহাভারত পরলাম তখন দেখলাম 'ধর্ম' কথাটা সেখানে শুধু 'ঠাকুরঘরে' আটকে না থেকে নানান জায়গায় নানান অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে; এই ধর্মের অর্থ কোথাও সত্য, কোথাও কর্ম, কোথাও নীতি, কোথাও আদর্শ, কোথাও ন্যায়, কোথাও বিবেক, কোথাও বুদ্ধি ইত্যাদি ইত্যাদি। কথা একটাই কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে তার মানে বা বলা ভাল, ইউসেজ আলাদা রকমের।
মহাভারত শেখালো ধর্মের লিমিটেশান কেবলমাত্র ঠাকুরঘর অবধি নয়, মানুষ যা ধারণ করছে সেটাই তার ধর্ম; এরসাথে সবসময় যে 'ঠাকুরঘর' বা ভগবানের সম্পর্ক থাকবেই তার কোন মানে নেই। পিতামহ ভীষ্মও তো হস্তিনাপুরের সিংহাসন আর শাষনব্যাবস্থা ম্যানেজ করতে গিয়ে নিজের অনড় প্রতিজ্ঞার পাহাড়ে বারবার ধাক্কা খেয়ে হস্তিনাপুরের অনেক ড্যামেজ করে দিয়েছিলেন। হাজার রকম বাধা-বিপত্তি এলেও ভীষ্ম নিজের প্রতীজ্ঞা ভাঙেননি তার প্রতীজ্ঞাই ছিল তার কাছে তার ধর্ম। চারদিক, পৃথিবী আর আকাশকে সাক্ষী রেখে নেওয়া ভীষ্মের সেই প্রতীজ্ঞার সাথে সরাসরিভাবে দেবতাদের কোন সম্পর্ক কিন্তু নেই।
অর্থাৎ, মহাভারত আমাদের দেখাল যে সত্য, নিষ্ঠা, ন্যায়, নীতি, আদর্শ ইত্যাদির সাথে বাড়ির কোনের সেই 'ঠাকুরঘর'টাও অবশ্যই ধর্ম (যেখানে দেব-দেবী-ভগবানরা চাল-কলা-বাতাশা-সন্দেশ-ধূপ-দীপ-আরতি নিয়ে বিরাজ করেন)। কিন্তু ঠাকুরঘরের সেই ধর্মটাই শুধু ধর্ম আর কোনটা নয়, এমনটা ভাবা ভুল। মহাভারত তো অন্তত তাই বলে।
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
মহাভারতে দেখা যায়, পিতামহ ভীষ্ম বালক যুধিষ্ঠিরকে ধর্মের দশটি পরিসর বা ranges সন্মন্ধে বলছেন- ধৈর্য্য, সংযম, ক্ষমা, সত্য, বুদ্ধি, বিদ্যা, চুরি না করা, অন্তরে-বাইরে শুদ্ধ থাকা, ক্রোধশূন্যতা এবং ইন্দ্রিয় নিগ্রহ। মহাভারতে 'ধর্ম' কথাটার ব্যবহার এত ব্যাপকভাবে হয়েছে সেটা কখনো কখনো পাঠকদের কাছে একটা confusing matter ও হয়ে যায়। একটা ঘটনা ঘটছে আর তাতে কোন চরিত্রের action বা reaction দেখে সাধারণ ভাবে সেটাকে অন্যায়-অধর্ম বলেই মনে হচ্ছে কিন্তু সেই ঘটনার অন্য চরিত্রটির action বা reaction-এ ঠিক সেটার উল্টোটা দেখা যাচ্ছে।
মহাভারত থেকেই একটা ঘটনা এর উদাহরন হিসাবে আলোচনা করা যাক। - কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় কর্ণের রথের চাকা মাটিতে বসে যাওয়ার ঘটনাটাতো বহু আলোচিত ও সবার জানা। কর্ণ যখন নিরস্ত্র অবস্থায় রথ থেকে নেমে প্রানপণে চাকাটিকে মাটি থেকে তুলবার চেষ্টা করছেন সেইমুহুর্তে শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশানুসারে অর্জুন তীর চালিয়ে নিরস্ত্র কর্ণকে বধ করলেন; অথচ নিরস্ত্র মানুষের উপর অস্ত্র প্রয়োগ করা তো শাস্ত্রে অধর্ম বলে গণ্য হয়। ভগবান হয়েও তাহলে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে অধর্ম করতে বললেন কেন? Well, এর স্বপক্ষে মহাভারতের যুক্তিটা এবার একটু দেখে নেওয়া যাক। - প্রথম থেকেই কর্ণ হিংসা ও envy-র মনোভাব রেখে অর্জুনের সাথে অধর্ম করেছে; হস্তিনাপুরের রাজসভায় পাঁচ পান্ডব আর দ্রৌপদীকে অপমান করার অধর্ম করেছে, অধর্মের পথে চলা দূর্যোধনকে আজীবন support করে গেছে ), কৌরবদের পক্ষ থেকে যুদ্ধ করার জন্য ধর্মের বিরুদ্ধাচরণও করেছে, (অধর্মের উপর কর্ণের indirect supportটা এখানে স্পষ্ট), সম্পর্কে জেঠু হয়েও যুদ্ধে অর্জুনের ছেলে অভিমণ্যূকে নৃসংসতার সাথে হত্যা করার নিরব সাক্ষী থেকে তাতে মদতও দিয়েছে - কর্ণের অধর্মের লিস্টটা আরো অনেক বড়। এহেন একজন অধর্মীকে বধ না করাটাও শাস্ত্রমতে একটা অধর্ম! উপরন্তু প্রারব্ধ মতে অধর্মীর সাথে অধর্ম করলে সেটা অধর্ম হিসাবে count হয়না বরং ধর্মের রক্ষা করার জন্য সেই 'অধর্ম' অবশ্য কর্তব্য। সুতরাং একটা ব্যাপার পরিষ্কার যে অর্জুনকে নিরস্ত্র ও অধর্মী কর্ণকে বধ করতে বলে শ্রীকৃষ্ণ মোটেই কোন অধর্ম বা অন্যায্য কাজ করেননি। কারণ at any cost ধর্মের রক্ষা করাটাই যখন শ্রীকৃষ্ণের main propoganda ছিল।
একজন মানুষ নিজের জীবদ্দশায় যা যা কাজ করে তার ফলগুলোও (results) সে তার জীবদ্দশাতেই পেয়ে যায় বা কখনও কখনও মানুষকে পরের জন্মগুলোতেও এই ফল ভোগ করতে হয়। ভালো কাজ করলে ভালো ফল আর খারাপ কাজে খারাপ। একেই কর্মফল বলে যা মানুষের মৃত্যুর মতই ইটারনাল- এজলেস একটা সত্য। মানুষের কর্ম আর ফলের এই সিস্টেমাটাইজার ব্যাপারটিকেই সাধারণভাবে মানুষের প্রারব্ধ বলে যা ঠিক করে মানুষ তার কোন কর্মটির জন্য কিরূপ ফল পাবে। (অনেক ভেবেও প্রারব্ধর কোন লাগসই সহজ বাঙলা পেলামনা; প্রারব্ধ সম্পর্কিত এই আলোচনাটি কিন্তু অতিসংক্ষিপ্ত)
মহাভারতের এরকম ভুরি ভুরি ঘটনা উদাহরন হিসেবে নিলে দেখা যাবে ধর্মের পরিসর গুলো আদৌ 'confusing' নয়, বরং আপেক্ষিক ('relative')। চিন্তাশীল মানুষ একটু চিন্তা করলেই যা বুঝতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস।
এই লেখার আগের দিকে ধর্মের যে দশটি range সন্মন্ধে বলা হয়েছিল একসঙ্গে সেগুলোর সবকটি আজকের যুগে কোন মানুষের মধ্যে দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। মহাভারতের যুগেও ঠিক এমনটাই ছিল। এমন কোন চরিত্রই সেখানে নেই যার সন্মন্ধে বলা যায় এনার মধ্যে ধর্মের সবকটি পরিসর দেখা যায়! এমনকি যুধিষ্ঠিরের কথাও যদি ধরা যায়, হস্তিনাপুরে পাশা খেলে তিনি নিজের প্রারব্ধে সঞ্চয় করা পূণ্য কর্ম গুলো ক্ষয় করেছিলেন; পাশা খেলার নেশায় তিনি নিজের সংযম হারিয়ে একে একে নিজের রাজ্য, স্বয়ং নিজেকে, নিজের ভাইদের ও last but not least, নিজের স্ত্রীকেও কৌরবদের কাছে হেরেছিলেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়েও তার নিজের গুরুকে মিথ্যে কথা বলাকে সাময়িকভাবে ধর্ম বলে ধরলেও প্রারব্ধ অনুসারে কিন্তু সেটা অধর্মই ছিল। মহাভারতে বলা আছে, যুধিষ্ঠিরের এই অধর্মের জন্যই তার রথের চাকা ভূমি স্পর্শ করেছিল। - যদিও যুধিষ্ঠিরের রথের চাকার ভূমি স্পর্শ করার ব্যাপারটা মহাভারতের লেখক/ কবির অতিরঞ্জিত করে লেখা বলেই আমার মনে হয়েছে। রথ নিশ্চই উড়তে পারতনা। হয়ত যুধিষ্ঠির উড্ডীয়মান কোন কিছুতে চড়ে (any helicopter like object) যুদ্ধ করতেন। হয়ত উল্লিখিত অধর্মগুলো করার জন্য যুধিষ্ঠিরকে যুদ্ধের ১৮ দিনের মধ্যে একদিন রথে চড়ে যুদ্ধ করার 'শাস্তি' পেতে হয়েছিল আর gravitational force অনুযায়ী রথের চাকা যে মাটি ছোঁবেই একথাতো ক্লাস টু-থ্রি পরা একটা শিশুও জানে। (সত্য-মিথ্যা জানিনা, তবে আমার এমনটাই মনে হয় কারণ aerial vehicle এর একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত মহাভারতে পাওয়া যায়। আর এই ইঙ্গিতটাই আমার মতকে কিছুটা হলেও stand করতে সাহায্য করে।....আসলে, বর্ণনা করতে গিয়ে বেদব্যাস মহাভারতের কয়েকটি চরিত্রকে তোল্লাই দিয়ে সাধারণের ধরা-ছোঁয়ার একেবারে ওপরে উঠিয়ে দিয়েছেন।)
যাইহোক আবার ধর্মের আলোচনায় ফিরে আসি, হস্তিনাপুরের মহারাজ পান্ডুও ঋষি কিন্দ্যম ও তার স্ত্রীকে ভুলবশত হত্যা করে ফেলেছিলেন; নরহত্যার এই গ্লানি তাকে তার মনের অন্তরে-বাইরে শান্তি দেয়নি। মহারানী কুন্তীও তার কুমারি অবস্থায় মা হওয়ার সত্য প্রায় আজীবন লুকিয়ে এসেছিলেন অর্থাৎ সত্য লুকিয়েছিলেন। ধৃতরাষ্ট্রের মধ্যেও ধৈর্য্য, ক্ষমা, সংযত থাকা ইত্যাদি এইসব ধর্ম পরিসর ছিলনা।
ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা ছিল সারাজীবন অবিবাহিত থাকা ও আমৃত্যু তার রাজ্যের রাজসিংহাসন ও মহারাজের সেবা করে যাওয়া। ভীষ্ম নিজের প্রতিজ্ঞাকে নিজের পরম ধর্ম বলে মানতেন যার জন্য বেঁচে থাকতে তিনি কখনই নিজের এই প্রতিজ্ঞা থেকে সরে আসেননি। এই প্রতিজ্ঞার কাছে কমিটমেন্টের জন্যই তার শেষ অবধি তাকে অনিচ্ছাকৃতভাবে ধর্মের বিরুদ্ধেই লড়তে হয়েছিল।
দ্রোণাচার্য্য ছিলেন কৌরব রাজবংশের অস্ত্রগুরু। যে কোন পরিস্থিতিতে হস্তিনাপুর রাজসিংহাসনের ডিফেন্সের জন্য হস্তিনাপুরের হয়ে লড়াই করতে তিনিও এক প্রকার বাধ্যই ছিলেন । তাই পিতামহ ভীষ্মের মত তাকেও নিজের অনিচ্ছাসত্বে ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে অধর্মের সঙ্গ দিতে হয়েছিল। দ্রোণাচার্য্য পুত্র অশ্বত্থামার ছোট থেকেই অভিযোগ ছিল দ্রোণাচার্য্য তার থেকে বেশী অর্জুনকে ধনুর্বিদ্যা শেখাতে আগ্রহী ছিলেন। তাই খুব obvious ভাবেই তার মনে অর্জুন ও বাকি পান্ডবদের সন্মন্ধে রাগ জন্মায় আর খুব স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধে তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে দূর্যোধনের দলে সে নাম লিখিয়েছিল।
কর্ণও অস্ত্রিশক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য পরশুরামকে নিজের মিথ্যা পরিচয় দিয়েছিলেন। অর্জুনের উপর রাগতো তার শুরুর থেকেই ছিল আর ছিল দূর্যোধনের প্রতি তার 'মিত্র বাৎসল্যতা'; এই 'commitment' এর জন্যই দূর্যোধনের সঙ্গে অধর্মের পথে চলতে কর্ণ পিছুপা হয়নি। 'মিত্র বাৎসল্যতা'কেই নিজের ধর্ম হিসেবে মেনে নিয়ে মহাভারতে কর্ণ তার পথ চলেছিল। হস্তিনাপুর রাজসভায় দ্রৌপদীকে অপমান করে কর্ণ স্বয়ম্বর সভায় দ্রৌপদীর তাকে করা অপমানটার ঝালতো মিটিয়ে নিয়েছিল কিন্তু সেইসঙ্গে ধর্মের বেশ কয়েকটি পরিসর হারিয়েওছিল তার চারিত্রিক দিক থেকে। সত্য, সংযম, ক্রোধশূন্যতা- ধর্মের এই কয়টি পরিসর কর্ণের মধ্যে দেখা যায়না।
যুধিষ্ঠির ছাড়া বাকি চার পান্ডবদের চরিত্রের মধ্যেও ধর্মের দশটি পরিসরের দশটিই হাজির ছিলনা। রাগ তাদের সকলের মধ্যেই ছিল। বিশেষত হস্তিনাপুরের রাজসভায় পাশা খেলার সময় দ্রৌপদীকে বাজি রাখার 'যৌধিষ্ঠিরিয় বাড়াবাড়ি' তে ভীমসেন ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে যুধিষ্ঠিরকে বলেছিল 'আপনি যদি আমার বড়ভাই না হতেন তাহলে পাঞ্চালিকে বাজি রাখার শাস্তি আমি আপনাকে অবশ্যই দিতাম।' ঐ সভাতেই দ্রৌপদীকে অপমানূচক কথা বলার পর কর্ণের উপরে অর্জুনও তার মেজাজ হারিয়েছিলেন। নিজের সুপুরুষ চেহারার উপর নকুলের ও নিজের বিদ্যার উপর সহদেবের অহংকার তাদের চরিত্রকে ধর্মের রেঞ্জের সবকটি দিয়ে পূরণ হতে দেয়নি।
অন্যদিকে, কৌরব ভাইদের মধ্যে এক বিকর্ণ ছাড়া আর কারো মধ্যেই ধর্মের কোন পরিসরই ছিলনা। (তাই বলে বিকর্ণের মধ্যেও যে সব ধর্ম পরিসরগুলো ছিল তা কিন্তু নয়; কিন্তু দূর্যোধনের করা অন্যায়-অধর্ম গুলোর বেশ কিছুর প্রতিবাদ কৌরবদের মধ্যে একমাত্র বিকর্ণকেই করতে দেখা গিয়েছিল মহাভারতে।)
মহাভারতের যুদ্ধ চলাকালীন খোদ শ্রীকৃষ্ণ নিজেও একবার পিতামহ ভীষ্মের উপর মেজাজ। হারিয়ে তাকে আক্রমণ করতে গিয়েছিলেন।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ চলাকালীন পিতামহ ভীষ্মের উপর, এই যুদ্ধেরই শেষ লগ্নে এসে অশ্বত্থামার উপর আর ওই যুদ্ধের বেশকিছু বছর পর যাদবদের উপরে ছাড়া মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণকে সেভাবে আর কোথাও রাগতে দেখা যায়না। শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে এই রাগ গুলি দেখিয়ে বেদব্যাস কি তাঁকে 'মনুষ্যত্ব' দিতে চেয়েছিলেন? কারণ, ভগবান বিষ্ণুকে তো সচরাচর এত রাগ করতে দেখা যায়না।.... হয়ত তাই - বেদব্যাস শ্ররীকৃষ্ণকে 'মনুষ্যত্ব'ই দিতে চেয়েছিলেন; অতি উঁচুদরের বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন একজন মানুষকে দেখাতে চেয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণের মাধ্যমে। (....একটা ব্যাপারতো স্পষ্ট, যে আমরা যা দেখেছি-বুঝেছি ব্যাসদেব মোটেও তা দেখাতে বা বোঝাতে চাননি।)
সুতরাং দেখা যাচ্ছে ধর্মের বাকি পরিসরগুলো সবার মধ্যে দেখা গেলেও 'সত্য' ও 'ক্রোধশূন্যতা' সবার চরিত্রে ছিলনা।
মহাভারতের এইরকম কিছু superstar - megastar দের দিকে তাকালে বোঝা যায় যে তারা তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধর্ম হিসাবে মেনে সবার আগে স্থান দিয়েছিলেন, তাদের কাছে ধর্মের অর্থ 'religion' এর অনেক আগে তাদের 'characteristics' ছিল। অর্থাৎ মহাভারতের যুগে প্রত্যেকটি চরিত্রের পালিত ধর্ম পরস্পর থেকে আলাদা ছিল। সেইজন্য কোথাও কোথও প্রচন্ড আপেক্ষিক ছিল এই ধর্ম। ফলস্বরূপ মহাভারতে 'ধর্ম' জিনিসটা বড়ই confusing বলে মনে হয়েছে।
অতএব, আমরা আমাদের ধর্মস্থান-মন্দির মার্কা 'সংকুচিত' ধর্মের নিরিখে যদি মহাভারতের সুপ্রসারিত ধর্মকে দেখতে যাই তাহলে এইরকম confusion হওয়াটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু ঘটনা হল, মহাভারত পরবর্তী বেশ অনেক বছর ধরেই সমাজের তথাকথিত মোড়লেরা ধর্মের সম্পর্কে আমাদের শুধু ভুলই বুঝিয়ে গেছে যার জন্য আজকের যুগে ধর্ম বলতে আমরা শুধু ভগবান-দেবতা-ঠাকুরঘর এসবই বুঝি। ঠাকুরঘর বা মন্দির -ধর্মস্থানের বাইরে এই ধর্মকে নিয়ে আসার কোন 'সাহস'ই আমরা আজকের যুগে তাই আর পাইনা বা দেখাইনা।
আমাদের দেশে মহাকাব্য নিয়মিত পড়েন ভক্তজন, আর চর্চা করেন গবেষকরা। সাধারণ মানুষ যদি মহাভারতকে গল্প হিসেবেও পড়ার অভ্যাস রাখত, ধীরে ধীরে বুঝতে পারত ধর্মের অরিজিনালিটি আর ডুপ্লিকেসির মধ্যে ফারাক টা কী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার বলেছিলেন, 'আমরা বিদ্যাকে নিজেদের বাহন করার পরিবর্তে বহন করে চলেছি।' ধর্মের ব্যাপারেও কিন্তু একই কথা প্রযোজ্য। শুনতে হাস্যকর হলেও এ কথা ঠিক যে ধর্মকেও আমরা বাহন করার বদলে বহন করে চলেছি। কোথায় আমরা ধর্মকে নিজের ইচ্ছায় চালাবো তা না, তার বদলে ধর্মই আমাদের ইচ্ছামত দৌড় করাচ্ছে! অ্যাকচুয়ালি, যেই ধর্ম আমাদের মুক্তি দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে, কিছু নির্বোধ সমাজপতিদের দৌলতে সেই ধর্মের হাতেই আজ আমরা বন্দী।
-© দেবাংশু গোস্বামী


সুন্দর।
ReplyDeleteপারলে যথার্থ গীতা-র 18টা অধ্যায় শুনিশ, আরও তথ্য পাওয়া যাবে।HINDI VERSION টা শুনতে বেশী ভালো তবে বাংলা ও হিন্দি দুটোরই কথা এক।
Xxxxxxxxxxx
ReplyDelete