Sunday, November 17, 2024

What if Hitler had won!

During the Durga Puja holidays, my 15-year-old niece was reading about World War II on the internet. The next morning, she asked me a strange question. "Uncle, what if Hitler had won World War II? Wouldn't Germany's division not have happened?" I had to say, "If that had happened, the change wouldn't have been limited to just Germany, but would have affected the entire world." 

- "How so?" She asked.

 I'm writing below what I briefly told my niece that day. It's nothing but a chilling thought experiment. If Hitler had won, the world would be vastly different and potentially catastrophic. Here's a possible scenario:


Immediate Consequences:


1. Europe under Nazi control: Germany would have expanded its territory, incorporating most of Europe.

2. Extermination of minorities: Nazis would have continued systematic genocide, targeting Jews, Romani, LGBTQ+, disabled individuals, and other perceived enemies.

3. Totalitarian regime: Hitler's dictatorship would have tightened its grip, suppressing dissent and opposition.


Global Impact:


1. Axis powers' expansion: Japan and Italy would have solidified their dominance in Asia and Africa.

2. World War III: Conflict with the Soviet Union, potentially leading to nuclear war.

3. Global economic instability: Nazi-controlled Europe would have disrupted trade, leading to economic chaos.


Long-term Consequences:


1. Loss of democracy: Democratic institutions would have been eradicated, replaced by authoritarian regimes.

2. Cultural destruction: Nazi ideology would have suppressed art, literature, music, and intellectual freedom.

3. Scientific stagnation: Research and innovation would have suffered under Nazi censorship and ideological constraints.


Alternative History:


1. No United Nations: International cooperation and global governance might not have emerged.

2. Different technological advancements: Research priorities would have shifted, potentially delaying or altering technological progress.

3. Altered global power dynamics: The balance of power would have shifted, potentially leading to a multipolar world.


Humanitarian Crisis:


1. Genocide and ethnic cleansing: Millions more would have perished in concentration camps.

2. Refugee crisis: Displacement and migration would have increased exponentially.

3. Psychological trauma: Survivors and families would have suffered intergenerational trauma.


Resistance and Opposition:


1. Underground movements: Resistance groups would have formed, fighting against Nazi occupation.

2. Guerrilla warfare: Partisans would have waged war against Nazi forces.

3. Eventual collapse: The Nazi regime would have eventually faced internal strife, economic strain, or external pressure.


This scenario serves as a stark reminder of the dangers of extremism, totalitarianism, and hatred. The Allies' victory in World War II ensured the preservation of democracy, human rights, and global stability.

It's a shortly defined an intriguing imaginary 'what-if' scenario. 


© Debangshu Goswami

Thursday, August 20, 2020

করোনা, লকডাউন ও কুকুর

 Street dogs; রাস্তার কুকুর। মানে রাস্তায় যেসব কুকুরেরা 'বিচরণ' করে। সাধারণ কথায় দেশী বা নেড়ি কুকুর। কেউ কেউ আবার বিদ্রূপ করে এদেরকে 'ঘি-য়ে ভাজা', 'লোম ওঠা', 'ঘা ওয়ালা' ইত্যাদি  এসবও বলে থাকে। স্বভাবে এরা একই সাথে প্রচন্ড অহংকারী ও নিরহংকারী দুই প্রকারেরই হয়ে থাকে। এছাড়াও এদের আরেকটি স্বভাব হল রাস্তা-ঘাট ফাঁকা পেলেই এরা সেখানে জেঁকে বসে ও নিজেদের মধ‍্যে অল্প-অল্প করে জায়গা ভাগ করে নিয়ে সেখানেই নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে 'রাজত্ব' চালায়। যাকে বলে একচ্ছত্র আধিপত্য। নিজেদের সেইসব ফিকটিশিয়াস রাজ‍্যের সীমায় বাইরের কেউ এসে পড়লে (মানুষ বা অন‍্য কোন প্রাণী) তার আর রক্ষা নেই; দলবল নিয়ে এইসা তাড়া দেবে যে 'অনুপ্রবেশকারী'দের তাতে একটা মিনি হার্ট অ‍্যাটাক আসতে বাধ‍্য। তবে এই ধরনের কুকুরদের স্বভাবের একটা ভালো দিক হ'ল, খুব বড়সড় কোন বেয়াদবি না করলে এরা চট করে কাউকে  কামড়ায়না। তবে লোকশূন‍্য ফাঁকা রাস্তা-ঘাটে এদের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়ে যায় যে কেউ মোটর গাড়িতে, সাইকেলে বা হেঁটে যেতে বড় একটা রাজী হয়না। কারণ, না কামড়ালেও জন্মগত অধিকার সূত্রে তাড়া তারা করবেই!


অন‍্যসব শহরের কথা ঠিক বলতে পারবোনা তবে আমার শিলিগুড়ির এই সমস্ত street dog গুলো একই সাথে প্রচন্ড খেপচুরিয়াস ও ডেঞ্জারাস! এহেন স্বভাবের কুকুরদের সাথে যদি আশপাশের রাজ‍্য, মানে গলি থেকে আরো কিছু কুকুর সঙ্গত দিতে চলে আসে তাহলে আর দেখতে হবেনা, ডাইনোসরের ঠাকুরদাদাকেও চোখে সর্ষেফুল দেখিয়ে ছেড়ে দেবে বলেই আমার বিশ্বাস। একচুয়ালি শিলিগুড়ির রাস্তার লালু, ভুলু, কালু, বাদশাদের উপর আমার আস্থা বরাবরই নিজের থেকেও বেশী!


কুকুরদের সাইকোলজি স্টাডি করে তাদের থেকে ধাওয়া খাওয়ার চান্সের বিষয়ে আমি কয়েকটি সিদ্ধান্তে এসেছি (তবে সিদ্ধান্তগুলো আমার মৌলিক আবিষ্কার নাও হতে পারে, মানে অন‍্য কেউ আমার আগেই একই সিদ্ধান্তে চলে আসতেই পারে),  " 'অনুপ্রবেশকারীর' গতি, কুকুরের ধাওয়া করার প্রবনতা ও কুকুরের ধাওয়া করার বেগ একে অপরের সমানুপাতিক।" উদাহরণ দিয়ে ভেঙে বললে, অনুপ্রবেশকারী যদি মোটরগাড়িতে থাকে তাহলে গতিবেগ বেশী হওয়ার জন‍্য কুকুরের থেকে তার ধাওয়া খাওয়ার চান্স সবচাইতে বেশী হয়; যদি মাঝারি গতির কোন সাইকেলে থাকে তাহলে সেই চান্সটা একটু কম আর অনুপ্রবেশকারী যদি প‍্যাডেস্ট্রিয়ান হয় তাহলে সেই ক্ষেত্রে তার ধাওয়া খাওয়ার চান্স সবচাইতে কম। আবার, পথিকদের পোশাক -আশাক বা বেশ-ভূষাও ধাওয়া করার এই প্রসেসটাতে 'অনুঘটক' হিসাবে কাজ করে। একইভাবে এই প্রণালিতে ব‍্যাস্তানুপাতিক ভাবে লক্ষ্য  করা যায় ট্রেসপাসার্সদের সংখ‍্যা ও রাস্তায় উপস্থিত কুকুরদের সংখ্যা। অর্থাৎ, অনুপ্রবেশকারীদের সংখ‍্যা যদি কুকুরদের সংখ‍্যার থেকে বেশী হয় তাহলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে কুকুরেরা হামলা-টামলা করতে বিশেষ আগ্রহ দেখায়না কিন্তু সংখ‍্যার ব‍্যাপারটা যদি উল্টো হয় তাহলে 'ইয়ে সির্ফ আপুনকা ইলাকা হ‍্যায়' গোছের একটা মনোভাব নিয়ে কুকুরেরা পথিকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেই পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে রাস্তার এই সব কুকুরের সামনে কোন বেচাল চাললে, দৌড়লে বা এদের লক্ষ্য করে ঢিল-টিল ছুঁড়লে (এই শেষ কাজটা যদিও কারো করা উচিতও না) এদের মনের ভিতরকার হিরোয়িক এনটাইটি জেগে উঠে আপনাকে বিপদে ফেলে দিতে পারে। এই ব‍্যাপারটার সাথে স‍্যার আইজ‍্যাক নিউটনের গতিসূত্রের দু'টো সূত্রের খুব মিল পাই। স‍্যার নিউটন বলেছিলেন, 'বাইরের থেকে বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির আর সচল বস্তু চিরকাল সচল অবস্থায় থাকে।' যেমন, জৈষ্ঠ‍্যের কোন শেষ দুপুরে কোন বাড়ি বা গাছের ছাওয়ায় নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে থাকা একটা কুকুরের গায়ে ঢিল না ছোঁড়া পর্যন্ত তার ভিতরকার রাগ তাকে সচল করেনা। পক্ষান্তরে, স‍্যার নিউটন যখন আবার বললেন, 'প্রত‍্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া থাকে ', তখনও ব‍্যাপারটা সহজেই মিলে গেল কারণ ঢিলটা না ছোঁড়া পর্যন্ত এক্ষেত্রে কুকুরটা ধাওয়া করে আসতনা। কারণ ছাড়া কার্য হয়না। আর এক্ষেত্রে 'কারণ'টাতো পথিক নিজেই দিয়ে দিয়েছে, এখন 'কার্যের' ঠ‍্যালাটাও নিজেই সামলাক!


সত‍্যি বলতে এইসব কারণেই কুকুরদের আমি ভীষণ ভয় পাই, তাদের সাথে বিশেষ দেখা-সাক্ষাত তো করতে চাইনা কিন্তু কপালফেরে দেখা হয়ে গেলে সবসময় তাদের মন জুগিয়ে চলার চেষ্টা করি। পিতৃদত্ব প্রাণ আমার একটা বই দু'টো তো নেই, বেকার কায়দা দেখিয়ে কী লাভ?


তবে সব নিয়মেরই ব‍্যাতিক্রম থাকে। এই নিয়মগুলোরও আছে। সব সময়েই  যে কুকুরেরা 'গোপাল বড় সুবোধ বালক'-এর স্টাইলে এইসব নিয়ম মেনে চলবে তার কোন গ‍্যারান্টি নেই। কোয়ান্টাম ফিজিক্স যেমন অবাধ‍্য ছেলের মত ক্লাসিকাল ফিজিক্সের কোন নিয়ম না মেনে সমস্ত হিসাব-কেতাব উল্টে দেয় তেমনই কুকুরেরাও যে কোন মুহুর্তে এই সব নিয়ম ভেঙে দিতেই পারে। এতে তারা নিজেরা যেমন শান্তি পায় ঠিক তেমনই বাকি প্রাণীজগতকে অশান্তির মুখে ঠেলে দেয়। হয়ত স্রেফ আনন্দ লাভ করে মজা পাবার জন‍্যই কুকুরেরা এইরকম ধাওয়া-টাওয়া দিয়ে থাকে, মানে যাকে বলে, জাস্ট ফর হ‍্যাভিং ফান। কিন্তু তাদের ফানের ঠ‍্যালায় আমাদের জান যে কয়লা হয়ে যায়, সেটা এদের কে বোঝাবে! 


এইবছরের গোড়ার দিকে আমাদের ভারতীয়দের সাথে যখনও পর্যন্ত করোনা ভাইরাস নামটির পরিচয় হয়নি তখনও রাস্তা-ঘাটে লোকজনের স্বাভাবিক ভীড়-ভাট্টা লেগেই থাকত, এতে করে  কুকুরগুলো বেশীরভাগ সময়েই তেমন সুবিধা করতে পারতনা। কিন্তু গত মার্চ মাসের শেষের দিকে  করোনা ভাইরাসের সংক্রমন রোখার জন‍্য সরকার বাহাদুর পুরো দেশে লকডাউনের ঘোষনা করে দিলেন। লকডাউনের অর্থ,  স্কুল-কলেজ-অফিস-কাছারি-বাজার-ঘাট-দোকানপাট-বাস-রেল-প্লেন সব বন্ধ; কেউ বাড়ি থেকে বেড়াতেও পারবেনা রাস্তা-টাস্তা একদম শুনশান; 'না বান্দা না বান্দে কি জাত' (সলমন খানের 'গর্ব' ছবির ফেমাস ডায়ালগ। )


মজার কথা, এর আগে লক আর ডাউন শব্দ দু'টা আলাদা আলাদা ভাবে শুনতেই অভ‍্যস্ত ছিলাম আর তখন এদের ব‍্যবহারগুলোও অন‍্যরকম ছিল; কিন্তু এই দু'টা শব্দকে যে মার্জ করে লকডাউন বলে কোন শব্দ হতে পারে আর তার ব‍্যবহারিক প্রয়োগ এতটা ব‍্যাপক হতে পারে  সেইবিষয়ে কোনো ধারনাই ছিলনা আমার! একই কথা 'সোশ্যাল -ডিসট‍্যান্সিং'-কথাটার ক্ষেত্রেও প্রযোজ‍্য। এরকম আরো অনেক ইংরেজি শব্দ আছে যেগুলো করোনা ভাইরাস মানবজাতিকে অ‍্যাটাক করার পরই জেনেছি। সেই দিক দিয়ে দেখলে স‍্যানিটাইজেশন শেখানোর সাথে সাথে করোনা ভাইরাস আমাদের ইংরেজির স্টক অব ওয়ার্ডও বেশ খানিকটা বাড়াতে সাহায্য করেছে।


যাইহোক, রাস্তা-ঘাটে লোকজন নেই আর এরকম অবস্থার সুযোগ নিয়ে শিলিগুড়ির বিভিন্ন রাস্তার কুকুরেরা যে নিজেদের সাম্রাজ্য তৈরী করতে সক্রিয় হয়ে উঠবে এতে আর কী সন্দেহ থাকতে পারে! গত মার্চ মাসে লকডাউনের পর থেকে পুরো ছবিটাই তাই সেইমত পাল্টে গেল। স্কুল-কলেজ, অফিস-বাজার সব বন্ধ হল। শুনশান রাস্তা-ঘাটে এখন শুরু হল কুকুরদের রাজত্ব। মানুষদের জন‍্য কাজ কমে গিয়ে ঠেকল মাত্র দু'টাতে, সারাদিন শুধু ঘরে বসে থাকা আর ঘন্টায় ঘন্টায় সাবান দিয়ে হাত ধোওয়া। আমিও মুখ বুঁজে ভালো ছেলের মত বাড়িতে থাকতে থাকতে হাঁফিয়ে উঠে মাঝেমাঝে  সন্ধ‍্যার সময় বাড়ির সামনের মোড়টাতে দাঁড়িয়ে থাকতাম। সেইসময় দেখতাম লকডাউন যাতে ভালোভাবে পালিত হয় সেইজন‍্য ইলেকট্রিসিটি বোর্ড রোড লাইট গুলোকেও অফ্ করে রাখত! এতে আলো না থাকার কারণে রাস্তার অন্ধকারটা স্বাভাবিকভাবেই আরেক  পোচ গাঢ় হয়ে যেত (ভুত-প্রেতদের পক্ষে বেশ আইডিয়াল একটা এনভায়রোনমেন্ট)। চারদিকে অন্ধকারটা পেয়ে শিলিগুড়ির রাস্তার কুকুরগুলো যে তাদের ফিকটিশিয়াস সেই রাজ‍্য গুলোর নিরপত্তার ব‍্যাপারে আরো কনশাস্ হয়ে উঠবে এ আর নতুন কথা কী? তবে ঐ সময়টাতে রাস্তায় সেরকম বেড়োতামনা বলে আমাকে কখনও সেইসব কুকুরদের মুখোমুখি পড়তে হয়নি; যদিও রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বা আমার ঘরের বিছানায় বসেই কখনও কখনও পাশের গলিটার থেকে একসঙ্গে ছয়-সাতটা কুকুরের রাগ-বিস্ময় ও বিরক্তি মেশানো  ঘেউ ঘেউ শব্দে প্রশ্ন ও তার সাথেই কোন পথচারীর 'সকরুণ মর্মস্পর্শি আর্তনাদ' ও হুটোপুটির শব্দ আমাকে, যাকে বলে, 'মর্মাহত' করে তুলত। লকডাউন চলাকালীন এই রকম বেশ কিছু ঘটনাও ঘটতে দেখেছি। 


একদিন দুপুরের দিকে খাওয়া-দাওয়ার পর ছাদে পায়চারী করছি এমন সময় দেখি আমাদের বাড়ির পেছনের গলিটা দিয়ে ঝরঝরে একটা অ‍্যাক্টিভাই বোধহয়, প্রায় ৬০ কিমি প্রতি ঘন্টার বেগে ডানদিক থেকে বাঁ দিকে বেড়িয়ে গেল আর ঠিক তার পেছন পেছনই ছুটে গেল আট-নয়টা কুকুর, তাদের গতিবেগও প্রায় ২০-২৫ কিমি প্রতি ঘন্টা। বাঁদিকে আর কিছুটা এগোলেই সামনে বড় রাস্তার মোড়, তাই কয়েক মুহুর্তের জন‍্য মনে হ'ল একটা বিচ্ছিরি অ‍্যাক্সিডেন্টের ব‍্যাপার না হয়ে যায়। তবে এই ধরনের কুকুরেরা খুব বেশীদূর পর্যন্ত ধাওয়া করেনা এটা জানতাম। এদের একটা নির্দিষ্ট গন্ডী থাকে যার বাইরে এরা সচরাচর যায়না। সেই অ‍্যাক্টিভা আর তার আরোহীটার সেদিন শেষমেশ কী হয়েছিল জানিনা। কারণ আমাদের ছাদের সামনের বাঁ দিকটায় বেশ কিছু  বাড়ি থাকায় আংশিক ঘটনাটা সেগুলোর আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছিল। তাই সবটা দেখতে পাইনি। তবে মনে হয়না বাড়াবাড়ি কিছু হয়েছিল বলে, কারণ কিছু হ'লে সেটা জানতে পারতাম।


আরেকদিনের কথা, সন্ধ‍্যাবেলায় আমি বাড়ির সামনের সেই মোড়টাতে দাঁড়িয়ে আছি হঠাৎ একটা বিটকেল 'গোঁওও' মতন যান্ত্রিক চিৎকারে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি ডানদিকে একটু দূর থেকে প্রচন্ড গতিতে একটা বাইক ছুটে আসছে। একটু কাছে আসতে বুঝতে পারলাম সেটা একটা কে.টি.এম বাইক যার সাইলেন্সলটা খোলা(এটাই সেই বিকট 'গোঁওও' আওয়াজটার উৎস)। বাইকে যে ছেলেটি বসে আছে সে নিতান্তই ফড়ে ধরনের। তার চেহারাটাও বেশ ইন্টারেস্টিং; কিশমিশকে দু'সপ্তাহ রোদে শুকালে সেটা যেরকম দেখতে হয় সেরকম চেহারা, মাথার চুল বেশ বাহারি করে ছাঁটা তবে আলো পড়ে আসা সেই সন্ধ‍্যাবেলাতেও চোখের হলুদ রঙের রোদ চশমাটার কী ইউসেজ ছিল সেটা যদিও বুঝতে পারলামনা! পরনে সবুজ রঙের একটা ফুলহাতা টি-শার্টের নীচে ডেনিম ব্লু রঙের হালফ‍্যাশনের ছেঁড়া জিন্সের প‍্যান্ট (কিছু লোক যে স্বেচ্ছায় ছেঁড়া জামাকাপড় পরে যে কী আনন্দ পায় তা বুঝিনা) , পায়ে লাল রঙের একটা স্পোর্টিং শু। সব মিলিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ছেলেটার বেশ একটা রঙচঙে অ‍্যাপেয়ারেন্স; বাইকারোহীদের এই রকম চোখে লাগা রঙিন উপস্থিতিতে কুকুরদের যে আপত্তি থাকতেই পারে এটা ছেলেটার আগেই বোঝা উচিত ছিল। আমি যখন ছেলেটাকে অবাক বিস্ময়ে দেখছি তখন সে বাইকসমেত আমার আরো কিছুটা কাছে চলে এসেছে; আর তাতেই তার প্রচন্ড গতির কারণটা বুঝতে পারলাম। দশ-বারোটা কুকুর এর পিছনেও ধাওয়া করেছে। 


এদিকে কুকুরদের সঙ্গে আমার কেমিস্ট্রিটাতো কোনদিনই সেরকম জমেনা, তাই কুকুরগুলোর সংখ‍্যা আর ওদের 'আগ্রাসী মনোভাব' দেখে আমার পা-বুক কাঁপা শুরু হয়ে গেল! একবারের জন‍্য খুব ইচ্ছা হচ্ছিল পাশের বাড়ির গেটটা খুলে ভিতরে ঢুকে যাই; একই পাড়ার লোক যখন, তখন হয়ত সেরকম কিছু বলবেনা, বিশেষ করে এরকম সংকটের মুহুর্তে। কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ে গেল রিসেন্টলি ওই বাড়িতেও ম‍্যাস্টিফ না কী জানি প্রজাতির একটা কুকুরের আমদানি হয়েছে। মানে, বাড়ির মালিক পোষার জন‍্য নিয়ে এসেছে আরকি! কথাটা মনে পড়তেই নিজের মনোবাসনাটাকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বাতিল করে দিয়ে নির্বিকারভাবে মোড়েই দাঁড়িয়ে রইলাম। তবে নিজের ইচ্ছায় নয়। আমার যে অঙ্গ-প্রত‍্যঙ্গ গুলোতে একটু আগে কাঁপুনি মতন ধরেছিল কুকুরের দলকে সামনে আসতে দেখে সেগুলো এখন অসাড় হতে শুরু করেছে। তাই খুবএকটা ইচ্ছা না থাকা সত্বেও দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ‍্য হচ্ছিলাম। 


এইসময়েই বোধহয়, বাইকটার স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেল আর সেটার স্পীড কমতে কমতে একটা ঝটকা মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল (হয়ত বাইকের কোন টেকনিক্যাল গোলোযোগ হয়ে থাকবে, তবে সঠিকটা বলতে পারবোনা।)। বাইকটা থেমে যাওয়ার পরেই আশ্চর্য হয়ে দেখলাম কুকুরগুলোও সেটার পেছনে ছোটা বন্ধ করে দিল। যেন, থেমে যাওয়া বাইকের পেছনে ছুটে এখন তারা আর নিজেদের এনার্জি নষ্ট করতে চায়না। এই ব‍্যাপারটাকে কুকুরদের একটা 'সাপোর্টিভ অ‍্যাক্ট' টাইপের কিছু বললেও খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবেনা। 'তুমি ছুটলেই আমরাও ছুটব, তুমি ছোটা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়লে আমরাও দাঁড়িয়ে যাব' তাদের ভাবটা যেন এমন; অস্বীকার করবনা, ডগ সাইকোলজির এই ব‍্যাপারটা আমারও খুব ভালো লাগে।


হ‍্যাংলা বাঘের হাত থেকে আচমকা ছাড়া পেলে হরিণ-টরিনদের মুখের যেরকম অভিব‍্যক্তি হয় (থ‍্যাংস টু ডিসকভারি আর ন‍্যাশনাল জিওগ্রাফিক টিভি চ‍্যানেল) তার সাথে, সাধু বাংলায় যাকে বলে 'কিংকর্তব‍্যবিমূঢ়', সেই টাইপের একটা ভাব মেশানো  মুখের এক্সপ্রেশান নিয়ে ফড়ে ছেলেটি বাইক থেকে নেমে ভগবানকে ধন্যবাদ জানালো বোধহয়। তারপর আবার বাইকে উঠে বসে চার-পাঁচ বারের চেষ্টায় সেটাকে স্টার্ট করে মাথা ঘুরিয়ে পিছন দিকটা  একবার দেখে নিয়ে বেড়িয়ে গেল।


আমি ভেবেছিলাম কুকুরগুলো এবার আমাকে নিয়ে  না পড়ে! কিন্তু না, খুবই তাচ্ছিল্যের সাথে আমাকে উপেক্ষা করে যেই দিক দিয়ে তারা এসেছিল সেইদিকেই আবার চলে গেল। বলতে নেই, আমিও এতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। হাত-পায়ের অসাড়তটাও কাটল!


এর মাস চারেক পরের একটি ঘটনা থেকে বুঝলাম কুকুরের এই ভয়টা মাঝে মধ‍্যে আমার মেমরি বুস্টার হিসাবে কাজ করে আমার ভেতরকার উদ্ভাবনী শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। কুকুরদের সাথে এই ঘটনার পাত্র এবার আমি নিজে।


ঘটনাটা গত মাসের ২৯ তারিখের। লকডাউনের তখন একেবারে ইলেভেন্থ আওয়ার চলছে। রাস্তায় দু-চারজন লোককেও দেখা যাচ্ছে। আমি আমার দিদির বাড়ি যাব বলে পায়ে হেঁটেই বেড়িয়েছি। উদ্দেশ‍্য, জামাইবাবুর থেকে তার পাওয়ার ব‍্যাঙ্কটা নিয়ে আসা। কোন কাজে বাড়ির বাইরে যেতে হলে (অফিস বা অন‍্য কোথাও) কোভিড-১৯ এর করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে সেই মার্চ মাস থেকেই আমার সাধারণ পোশাকের সাথে অভিন্নভাবে আরোকয়েকটি  পোশাক জুড়ে গেছে, যেমন মুখে মুখোশ (মাস্ক), হাতে প্রায় কনুই পর্যন্ত ঢাকা দস্তানা (গ্লাভস), মাথায় কান পর্যন্ত ঢাকা যায় এমন টুপি (যেগুলো সার্জিক্যাল অপারেশনের সময় ডাক্তারবাবুরা পড়ে), পায়ে বুট বা স্পোর্টিং শু (বাট নট স‍্যান্ডাল) যাই হোকনা কেন তার উপরে একটা প্লাস্টিকজাতীয় আবরণী, চোখের চশমাটা অবশ‍্য রিয়‍্যাল। এইসব পড়ে যে আমাকে ঋত্বিক রোশন বা টম ক্রুজের হ‍্যান্ডসাম দেখতে লাগে তা কিন্তু না। তবে ঐ যে কথায় বলেনা, নিজে বাঁচলে বাপের নাম- সেই ব‍্যাপার আর কি!


আমার এই অপারেশন থিয়েটার মার্কা বেশ-ভূষায় আর কারো আপত্তি না থাক কিন্তু কুকুরদের যে আপত্তি থাকতেই পারে সেটা অন্তত আমি কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারিনা। সেদিন আমি যে রাস্তা দিয়েই দিদির বাড়ির দিকে যাব বলে পা বাড়াচ্ছি সেই রাস্তাতেই দেখি দশ-বারোজন সড়ালে-নেড়ি টাইপের লালু-ভুলু-কালুরা শুয়ে-বসে আছে, পায়চারি করছে বা যেন আমাকে অভ‍্যর্ত্থনা জানানোর জন‍্য আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে; ছোটবেলা থেকেই 'কুকুরোফোবিয়া' (বলাইবাহুল‍্য এটা আমার নিজের বানানো শব্দ, ডিকশনারিগুলোতে পাওয়া যাবেনা)-য় ভুগতে থাকা আমার পক্ষে এটা খুবই অস্বস্তিকর একটা পরিস্থিতি। কোনরকম কুকুরকে আমি কখনই কোনো ভাবে বিরক্ত করাটা পছন্দ করিনা; আর এরকম দৃশ‍্যও আমার একদম ভালো লাগেনা। তবুও প্রতিটা গলিতে ঢুকেই আমার দু'চোখের 'সন্ধানী দৃষ্টি' সবার প্রথমেই এরকম দৃশ্য খুঁজে নিচ্ছে আর সাথেসাথেই কোন এক অদৃশ‍্য শক্তি যেন আমার পা দু'টোকে সেই গলি থেকে বার করে অন‍্য গলিতে নিয়ে গিয়ে ফেলছে! কুকুরদের ভয়ে আর তাদের অত‍্যাচার থেকে বাঁচতে এভাবে একের পর এক রাস্তা, একের পর এক গলি বদল করে যাচ্ছি।


আমাদের বাড়ি থেকে দিদির শ্বসুড়বাড়ি যাওয়ার যে ছাব্বিশটা রাস্তা এর আগে চিনতাম তার প্রত‍্যেকটাতেই কুকুরদের অতন্দ্র পাহারা দেখে আরো অনেক ঘুরে ঘুরে আবিষ্কার বা উদ্ভাবন করলাম, ছাব্বিশটা নয়, আমাদের বাড়ি থেকে মোট আটচল্লিশটা রাস্তা দিয়ে দিদির শ্বসুড়বাড়ি যাওয়া যায়। সেই আটচল্লিশ নম্বর রাস্তাটার মোড়ের থেকে অল্প একটু দূরে চার-পাঁচটা কুকুর দেখলাম শুয়ে-বসে আছে আর তাদের মধ‍্যে দু'টি অপারেশন থিয়েটার মার্কা পোশাক পরা আমার দিকে চোখ-টোখ কুঁচকে খুবই বিরক্তির সাথে তাকিয়ে আছে। মিথ‍্যা বলবনা, তাদের সেই চোখ রাঙানো দেখে আমার বুকের ভিতরটা ভারী খালি-খালি লাগছিল। নিজের চোখটা নামিয়ে ভাবছিলাম ঐ রাস্তাটা দিয়ে আমি দিদির বাড়ির অনেকখানি সামনে চলে এসেছিলাম এখন যদি কুকুরগুলোর চোখ রাঙানোর জন‍্য এই রাস্তাটাও আমাকে আবার চেঞ্জ করতে হয় তাহলে ভারী মুশকিলে পড়ে যাব। এমন সময় একটা চাপা গড়গড়ানির আওয়াজ শুনে চোখ তুলে দেখি যেই দু'টো কুকুর একরাশ বিরক্তি নিয়ে এতক্ষণ আমার  দিকে তাকিয়েছিল তাদেরই একজন আমাকে দেখে ভুকবার তাল করছে। সর্বনাশ! কুকুরের 'ঘেউ' সাংঘাতিক ছোঁয়াচে জিনিস। ইনি একবার ডেকে উঠলেই তার ডাকে সাড়া দিয়ে পুরো হাকিমপাড়ার সব কুকুরেরা ভুকতে ভুকতে আমাকে ভুক্তভোগী করে তোলার জন‍্য ছুটে আসবে! বাধ‍্য হয়ে একটানে মাথার টুপিটা খুলে ফেললাম, তাতে আমার বেশ-ভূষা খানিকটা হলেও স্বাভাবিক হ'ল আর এও বুঝলাম যে করোনা ভাইরাসের চেয়েও কুকুরের ভয়টাই এখনো আমার কাছে অগ্রাধিকার পায়! এইসময় বেচাল করলে আর রক্ষা নেই; মনকে যথাসম্ভব শান্ত করে বোঝাতে থাকলাম, এই তো আর কয়েক পা এগোলেই গন্তব্যে  পৌঁছে যাব, এখন যদ্দুর সম্ভব স্বাভাবিকই থাকতে হবে। তাই করলাম, মাথার টুপিটাতো আগেই খুলে ফেলেছিলাম তার সাথে মুখে জোর করে একটা নির্বিকারভাব নিয়ে মোড়টা পেরিয়ে গলিতে ঢুকে পড়লাম (যদিও বুকের ভিতরটায় তখন শয়ে শয়ে দামামা বাজছে)।


আমাকে শান্ত দেখেই হোক বা অন‍্য কোন কারণেই হোক কুকুরমশাই তার গড়গড়ানিটাকে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে নিয়ে গেলেননা; চুপ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন। এই দৃশ‍‍্যটা দেখে এবার আমার মনে এমন একটা প্রগাড় শান্তির ভাব আসল, যেমনটা ছাত্রজীবনে কোন কোন ত‍্যাঁদড় ব‍্যালান্স শিট মিলিয়ে আসত। বাকি রাস্তাটুকুতে কুকুর -টুকুর কেউ নেই, এখন শান্তি করে শান্ত মতন হেঁটে যেতে পারবো।


দিদির বাড়ি থেকে কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে যখন ভাবছি যে আবার এই 'সারমেয়-শঙ্কুল' পথ গুলো দিয়ে আমাকে ফিরতে যখন হবেই তখন কীভাবে ফিরব তার একটা প্ল‍্যান ছকে নেওয়া দরকার তখনই বেশ খানিকটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই একটা সাইকেল রিক্সা পেয়ে গেলাম! 'ভাই রবীন্দ্রনগর যাব, কত ভাড়া নেবে?' উত্তরের 'চল্লিশ টাকা দেবেন' কথাটা অন‍্যসময়ে শুনলে ভাড়াটাই করতামনা একথা হলফ করে বলতে পারি। কিন্তু সেদিনের ব‍্যাপারটা একদম আলাদা ছিল। 'বেশ তাই চলো' বলে রিক্সায় উঠে বসে মনে মনে ভগবানকে একটা নমো ঠুকে বললাম 'ভগবান, কে বলে তুমি নেই?'

Saturday, July 11, 2020

১৯৫০ ফুটবল বিশ্বকাপ, ভারত ও AIFF


--------------------------------------------

বিশ্বকাপ ফুটবলের মত রিমার্কেবল ইভেন্টে ভারত খেলেনা বা খেলার সুযোগ পায়না বলে আমরা, ভারতীয়দের একাংশ, বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে তেমন ইন্টারেস্টেড হতে পারিনা, ; বাকি যারা উত্তেজিত হই তারা কেউ কেউ ব্রাজিল, কেউ কেউ আর্জেন্টিনা, কেউবা ইটালি, জার্মানি এইসব বাঘা বাঘা দলের সমর্থনে গলা ফাটিয়েই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাই আর আক্ষেপ করে বলি "আহা, অলিম্পিকের পর 'গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ' নামে ভূষিত হওয়া এই খেলাটায় যদি আমার দেশটাও খেলতে পারত তাহলে কত আনন্দই না হত!"

সালটা ১৯৫০। বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিদ্ধস্ত ইউরোপের বদলে যুদ্ধে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতি হওয়া দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলে বসল ৪র্থ বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর। বিশ্বযুদ্ধের কারণে এর আগে বিশ্বকাপ ফুটবলের টানা দু'টি এডিশান বাদ গেছে (১৯৩৮ সালের পর থেকে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলও অনুষ্ঠিত করা যায়নি অন‍্যান‍্য sporting event-এর মতই) সুতরাং বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রায় হারিয়ে যাওয়া জৌলুস ফিরিয়ে নিয়ে আসার গুরুদায়িত্ব এখন ব্রাজিলের কাঁধে। এই বিশ্বকাপের মূলপর্বে ভারতের খেলার সুযোগ পেয়েও শেষমেশ কোন রহস‍্যময় কারণে অংশগ্রহন না করার ঘটনাটা হয়ত সবারই জানা। সুযোগ পেয়েও ব্রাজিল সফর না করার কারণ হিসাবে AIFF (All India Football Federation)-এর পক্ষ থেকে কিছু যুক্তিও জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল; যদিও এইসব যুক্তির কোনটাই খুব সন্তোষজনক (satisfactory) ছিলনা।

এই পর্যন্ত পরে অনেকেরই মনে হতে পারে করোনা ভাইরাসের এই মর্মান্তিক অথচ রমরমে বাজারে আমি আবার ফুটবল নিয়ে আলোচনা করছি কেন? আসলে আমরা ভারতীয়রা স্বাধীনতার পাওয়ার পর থেকে নিজেদের অ‍্যাডভান্সমেন্টের ব‍্যাপারে কতটা ইররেসপন্সেবল হয়ে গেছি সেটা জানানোই আমার উদ্দেশ্য।



যাইহোক আলোচনায় ফিরি, যে কোন বছর বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন‍্য সারা পৃথিবী জুড়ে দেশগুলোকে নিয়ে প্রথমে qualifying round- এর খেলা হয়, এমনকি আগের বছরের বিজয়ী দলগুলোও এই কোয়ালিফাইং-এর হাত থেকে নিস্তার পায়না, তাদেরকেও কোয়ালিফাইং রাউন্ডের ম‍্যাচ গুলো খেলেই মূলপর্বের জন‍্য 'যোগ‍্যতা অর্জন' করতে হয়। এ কথা আমরা সবাই জানি। এই মুহুর্তে একটা বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগের বাছাই পর্ব (qualifying round) গুলোতে যেমন ২০০টি দেশ অংশ নেয় ও ৮০০-র ওপরে কোয়ালিফাইং ম‍্যাচ হয় (২০১০ সাল থেকে এই সংখ‍্যাটা ৮৫০), ১৯৫০ বিশ্বকাপের আগে বাছাই পর্বে কিন্তু এই সংখ‍্যাটা এত ছিলনা। মাত্র ৩৩টি দেশ সেবার বিশ্বকাপ ফুটবলের বাছাই পর্বগুলিতে অংশ নিয়েছিল; হয়ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের 'চরম ধ্বংসলীলাই' এর জন‍্য দায়ী ছিল। তখন কোয়ালিফাইং রাউন্ড গুলোর জন‍্য FIFA (Federation of International Football Association)-র নিয়মকানুন আজকের মতো এত elaborate ও analyzed ছিলনা। যেমন, continental qualifiers -এর ব‍্যাপারটা তখনও ছিলনা; সফরগুলোর কারণে প্লেয়ারদের যাতে অতিরিক্ত ক্লান্তি না আসে সেইজন‍্য ফিফা তখন দেশ গুলোর ভৌগোলিক অবস্থানের ব‍্যাপারটাকে বেশী গুরুত্ব দিত কারণ ঐ সময়ে বিমানযাত্রা আজকের মত এত available ছিলনা, দূরের কোন দেশে যাতায়াত করতে গেলে জল-জাহাজকেই বেশী প্রেফার করা হত। ১৯৫০ বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইং রাউন্ডে ভারত তাই মনোনীত হল মায়ানমার (তখনকার বার্মা) ও ফিলিপিন্সের সাথে একই গ্রুপে। গ্রুপ ১০। কিন্তু রাজনৈতিক ডামাডোলের কারণে বার্মা ও ফিলিপিন্স নিজেদের নাম প্রত‍্যাহার করে নেওয়াতে কোয়ালিফাইং রাউন্ডের গ্রুপ ১০ থেকে ভারত কোন ম‍্যাচ না খেলেই  অনেকটা কুড়িয়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মত সরাসরি ১৯৫ বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার সুযোগ পেয়ে যায়। যদিও দুঃখের বিষয় এই যে, এরকম একটা golden opportunity পাবা পরেও ভারত সেই বিশ্বকাপে দল পাঠালনা। All India Football Federation (AIFF)-এর তরফ থেকে কারণ দেখানো হ "disagreements over team selection and insufficient practice time"; এই ছিল নিজেদের দেশের প্রতি-দলের প্রতি AIFF-এর দায়িত্ব!! 

একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, ১৯৫০ বিশ্বকাপের অফিশিয়া ফিক্সচার রিলিজ হয়ে যাবার পরে ভারত কিন্তু ঐ টুর্নামেন্ট থেকে নিজেদের নাম উইথড্র করেছিল। সেই বিশ্বকাপে ভারতের খেলতে হত পুল থ্রি তে প‍্যারাগুয়ে, সুইডেন ও ইটালির বিরুদ্ধে প‍্যারাগুয়ে কিন্তু তখন আজকের মত এত শক্তিশালী দল ছিলনা। ইটালিও সেই বিশ্বকাপে স গ্রেডের একটা দল পাঠিয়েছিল কারণ তাদের প্রথম একাদশের নিয়মিত আটজন খেলোয়াড় ১৯৪৯ সালে একটি প্লেন দূর্ঘটনা নিহত হয়েছিল। তাছাড়া  জলপথে ব্রাজিল আসার কারণে ইটালিয়ান খেলোয়াররা দৈহিক ভাবেও অবসন্ন ছিল। থাকার মধ‍্যে শুধু সুইডেন দলটাই যা একটু কঠিন ছিল তৎকালীন শক্তিসমৃদ্ধ ভারতীয় ফুটবল দলের কাছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে দেখা যায়, বিশ্বকাপে খেললে ভারত সেবার প্রথম রাউন্ডের বাধা টপকে দ্বিতীয় রাউন্ডেও উঠে আসতে পারত। কারণ সেইসময় ভারতীয় ফুটবল দল যথেষ্ট শক্তপোক্ত ছিল, আজকের মত এতটা হেলাফলার ছিলনা; ১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকে ভারতীয় দলের দূর্দান্ত পারফরম‍্যান্সই এর প্রমাণ আর ব্রাজিলে ভারতের সেইদলটাই যেত।

ব্রাজিল বিশ্বকাপের কর্মকর্তারা ১৯৫০ সালে তাদের দেশের মাটিতে একটি আদর্শ বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চাচ্ছিলেন হয়ত সেইজন‍্যই চেয়েছিলেন যাতে মহাত্মা গান্ধী ও জহরলাল নেহেরুর দেশ এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করুক। উপরন্তু ভারতীয় দলের খেলায় তখ ফিজিক্যাল ফুটবলের নাম-গন্ধ ছিলনা, ছিল স্কিলফুল ফুটবল। স্কিলফুল ফুটবল সবসময়ে সবাইকে আকৃষ্ট করে আর ব্রাজিল দেশটাতো বরাবরই স্কিলফুল ফুটবলের পুজারী। ব্রাজিল বিশ্বকাপের অর্গানাইজারস্ থেকে শুরু করে ব্রাজিলের আম জনতা সবাই তাই স্বাভাবিক ভাবেই চেয়েছিল ভারত যেন খেলে তাই প্রথমবা AIFF-এর না করা সত্বেও ১৯৫০-এর মার্চ-এপ্রিল মাসে ব্রাজিল থেকে কর্মকর্তারা আবার AIFF-এর সাথে যোগাযোগ কর ও ভারতীয় দলটাকে বিশ্বকাপে পাঠাতে বলে, তারা এও বলে AIFF যদি ভারতীয় দলকে বিশ্বকাপে পাঠায় তাহলে ভারতীয় দলের ব্রাজিল যাতায়াতের যাবতীয় খরচের বেশিরভাগটাই তারা বহন করবে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, ব্রাজিল কিন্তু পৃথিবীর ধনী দেশগুলোর গুনতিতে পরেনা। এরপরেও ভারত যখন আসতে রাজী হলনা তখন বাধ‍্য হয়েই চার দলের পুল থ্রি কে তিন দলে নামিয়ে বিশ্বকাপ খেলাতে বাধ‍্য হল FIFA। 

১৯৫০ বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া সত্বেও ভারত কেন দল পাঠালনা তা নিয়ে কিন্তু AIFF কোনদিনই কোন clear-cut কারণ দেখায়নি। তৎকালীন ভারত সরকারও এ বিষয়ে ইতিবাচক ধারনাই পোষণ করত। এমনকি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুও বুঝতে পেরেছিলেন একটা জাতির উন্নতি ও আন্তর্জাতিক পরিচয় গঠন করতে খেলাধুলার কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। সদ‍্য স্বাধীনতা পাওয়া ভারতের কাছে এই দুটোর খুব দরকারও ছিল। যদিও AIFF-এর 'বদান‍্যতায়' এইরকম একটা ওয়ান্স ইন এ লাইফটাইম চান্স ভারত হারিয়ে ফেলেছিল। 

এই ঘটনায় AIFF-এর দেখানো একাধিক কারণের মধ‍্যে থেকে যেই কারণটা সবচেয়ে বেশি ফুটেজ খেয়েছিল সেটা হল, FIFA-র নিয়মানুসারে সব খেলোয়ারদের বুট পড়ে খেলতে হবে। AIFF ভয় পেয়েছিল, বুট পড়ে খেলায় অনভ‍্যস্ত ভারতীয়রা হয়তো পেশাদার দল গুলোর কাছে বিশ্রী ভাবে হারতে পারে আর এতে ১৯৪৮ সালের অলিম্পিকে তাদের অর্জন করা সুনাম বিপদে পড়তে পারে। আরো একটা কারণ দেখিয়ে বলা হল ভারতীয় ফুটবলারেরা ৯০ মিনিটের খেলায় একদম অভ‍্যস্ত নয়। (এটা কিন্তু সত‍্যি; ১৯৭০ পর্যন্ত ভারতীয় ফুটবলের ঘরোয়া লিগগুলি হকি খেলার মত ৭০ মিনিটের হত।) ৭০ মিনিট পর্যন্ত খেলে অভ‍্যস্ত ছেলেগুলি ৯০ মিনিট খেললে ক্লান্তির চোটে শেষমুহুর্তে গোল হজম করে বসতে পারে। যদিও এসব বিষয়ে নিজেদের তৈরী করে নেওয়ার জন‍্য AIFF-এর কাছে একবছর সময় ছিল।

অনেকেই বলবেন সেইসময়ে ভারতের ব্রাজিলে দল না পাঠানোর আরেকটি কারণ হতে পারে অর্থাভাব। দেশে সবে স্বাধীনতা এসেছে, অর্থনীতিটাও চাঙ্গা হয়নি এখোনো এরই মধ‍্যে খেলোয়ারদের প্রপার ট্রেনিং, ফুডিং, ব্রাজিল যাতায়াতের খরচ প্রভৃতি বিশ্বকাপের জন‍্য এত খরচ করার মতো টাকা কোথা থেকে আসবে? -পারসোনালি আমি এই মতামতে বিশ্বাস করিনা। দেশে পর্যাপ্ত রেভেনিউ নেই মানলাম, কিন্তু ব্রাজিল থেকে যাতায়াতের ভাড়ার মেজর পোর্শানতো অফার করা হয়েইছিল আর বাকিটা FIFA-র থেকে জোগাড় করা যেতনা? Easily যেত যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী তাতে হস্তক্ষেপ করতেন। আর তাছাড়াও এর দুই বছর আগেই, অর্থাৎ স্বাধীনতার পরের বছরেই ইংল‍্যান্ডে গিয়ে ভারত অলিম্পিক খেলে এসেছিল, তখন ভারতীয় ফুটবল দল কোথা থেকে টাকা পেয়েছিল?

আরো একটা ব‍্যাপার আছে,  বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৫০ সাল নাগাদ বিশ্বকাপ ফুটবল তার অনেকটাই জৌলুস হারিয়েছিল। AIFF-ও বিশ্বকাপের থেকে অলিম্পিক ফুটবলকেই বেশী গুরুত্ব দিয়েছিল সেইসময়। তাই বিশ্বকাপের আবেদনে তেম সাড়া দেয়নি।

পেশাদারিত্ব ও অপেশাদারিত্বকেও একটা হাতিয়ার বানিয়েছি AIFF- যদি ভারতীয় ফুটবলারেরা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে ফেলে তাহলে তারা পেশাদার খেলোয়ার হিসাবে গণ‍্য হবে এবং অলিম্পিক বা এশিয়ান গেমসে আর খেলার সুযোগ পাবেনা। কারণ ঐ সময়টাতে শুধু অপেশাদার খেলোয়ারদেরই অলিম্পকে খেলার অনুমতি ছিল।

ফুটবল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ বা ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজন যেকোন দেশের আভ‍্যন্তরীন পরিকাঠামো, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক স্তরে সেইদেশের পরিচিতি বাড়াতে সাহায্য করে। একথা আজকে পৃথিবীর সব দেশ এককথায় স্বীকার করে। 

স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে আমরা, ভারতীয়রা যেকো বিষয়ে পারদর্শীতা দেখানোর চাইতে অজুহাত দেখানোটাই বেশী পছন্দ করি। ১৯৫০ সালে AIFF এই ব্রাজিলের ইনভিটেশান অ‍্যাক্সেপ্ট না করে ঐ ন‍্যাকামোগুলো না করলে আজকে ব্রাজিল -ইটালি-জার্মানির মতো ভারতও হয়ত বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে একটা জায়গা দখল করে থাকত।

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা FIFAও ১৯৫০ বিশ্বকাপ থেকে ভারতের 'last minute withdrawal '- এ প্রচন্ড বিরক্ত হয় ও ঠিক এরপরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ থেকে AIFF-এর এন্ট্রি বন্ধ করে দেয়। সেই থেকে একটা ঠাণ্ডা যুদ্ধ চলতে থাকে AIFF ও FIFA-র মধ‍্যে। এর অনেক পরে AIFF-এর জেনারেল সেক্রেটারি প্রয়াত অশোক ঘোষের বহু প্রচেষ্টার পর FIFA কিছুটা নরম হয় ও ১৯৮৪-৮৫ সাল থেকে বিশ্বকাপ ফুটবলে আবার AIFF-এর এন্ট্রি গ্রহন করে। সেইবার থেকে প্রতিবছরই ভারত বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে খেলে আসলেও মূলপর্বের যোগ‍্যতা এখনো অর্জন করতে পারেনি।

সুযোগ পেয়েও বা খোদ আয়োজকদের থেকে আমন্ত্রণ পেয়েও সেই বিশ্বকাপে দল না নামানোর দাম ভারতীয় ফুটবল আজও চুকিয়ে যাচ্ছে।  সুযোগের ফায়দা সবসময়ই ওঠানো উচিত; বিশেষকরে, কুড়িয়ে পাওয়া সুযোগের তো বটেই। 



একটা ঘটনার কথা বলে লেখাটা শেষ করি, ১৯৯২ সালে ভারতের মতই একটা পড়ে পাওয়া সুযোগ পেয়েছিল ডেনমার্ক। তবে সেটা ছিল ইউরো কাপ। ইউরো কাপ গুলোতেও মূল পর্বের খেলা শুরুর আগে বাছাই পর্বের খেলা হয়। এছাড়াও ইউরো কাপ আর বিশ্বকাপের নিয়মে তফাৎ প্রায় নেই বললেই চলে। ইউরো কাপের বাছাই পর্বের ডি গ্রুপ থেকে প্রথমে যুগোশ্লাভিয়া দেশটি মূল পর্বে খেলার যোগ‍্যতা পায় কিন্তু যুগোশ্লাভিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশটা শেষমেশ মূলপর্ব থেকে সরে আসে। তার বদলে সুযোগ পায় দ্বিতীয় স্থানে কোয়ালিফাইং রাউন্ড শেষ করা ডেনমার্ক। এই আচমকা পাওয়া সুযোগকে ডেনমার্ক সেবার দারুন ভাবে কাজে লাগিয়েছিল। শুধু মূলপর্বে অংশগ্রহন করেই থেমে না থেকে সব্বাইকে অবাক করে দিয়ে সেবারের ইউরো কাপের ফাইনাল ম‍্যাচে মহাশক্তিশালী জার্মানিকে ১-২ গোলে হারিয়ে ১৯৯২-এর ইউরোপ সেরাও হয়েছিল। -- রূপকথা মনে হচ্ছে? সুযোগের সদ্ব‍্যবহার করা একেই বলে। এখনও পর্যন্ত ভারত যেটা কোনদিন করতে পারেনি। এরপরেও ডেনমার্ক অনেক ইউরো কাপ ও বিশ্বকাপে নিজেদের সাড়া জাগানো অংশীদারি রেখেছে ও আশা করাই যায় যে আগামীতেও রাখবে। সারা বিশ্বে আজকে ডেনমার্কের পরিচিতি কিন্তু ফুটবল দিয়েই শুরু। ডেনমার্কের মতই বহু দেশেরও international identity ফুটবলের এইরকম major event গুলোতে অংশ নেওয়া থেকেই এসেছে।


-দেবাংশু গোস্বামী

Friday, July 10, 2020

মহাভারতের ধর্ম:



  
    আর পাঁচটা শিশুর মত ছোটবেলায় আমিও ঠাকুরঘর (ভগবানের এই নামটা কোত্থেকে এল জানিনা) থেকে কলা-বাতাশা-সন্দেশ এসব 'চুরি' করে খেতাম। প্রসাদ হিসাবে খাওয়ার চেয়ে চুরি করে খাওয়ার মধ‍্যে যে কী শিশুসুলভ আনন্দ থাকে তা আজও বুঝতে পারিনি। এর জন‍্য আমার ঠাকুমার থেকে বকাও খেতাম প্রচন্ড।  ঠাকুমা বলতেন- এভাবে চুরি করে খাওয়া অন‍্যায়, ওতে অধর্ম হয় আর ভগবান তাতে 'পাপ' (অভিশাপ) দেয়। আমি তো ভয়-টয় পেয়ে পরের তিন-চার দিন হয়ত ঠিক থাকতাম কিন্তু পঞ্চম দিনের দিন দেখা যেত ঠাকুরঘরে রাখা সন্দেশের প‍্যাকেট থেকে একটা সন্দেশ আবার আমার উদরস্থ হয়ে গেছে! তাই বলে ভগবানের উপর, অধর্মের উপর, পাপের উপর যে বিশ্বাস করতাম না তা কিন্তু নয়; তখন মনে মনে নিজেকে এই বলে সাহস সঞ্চয় করতাম যে, ওতগুলো সন্দেশের থেকে একটা নিলে 'ঠাকুর' কিছু বলবেনা। 'পাপ' দেবেনা। - হয়ত সেই বয়সে পাপ-পূণ‍্য বোধ মনের মধ‍্যে তৈরী হয়নি বলেই 'ঠাকুর'কে নিজের বন্ধুগোত্রের কেউ মনে করে খুবই সহজ ভাবে এমনটা করার সাহস পেয়ে যেতাম। বয়স বাড়লে ধীরে ধীরে আমার ভেতরে পাপ-পূণ‍্য বোধের ব‍্যাপারটা তৈরী হওয়ার সাথে সাথেই ঠাকুরঘর থেকে এই 'অকারণ চুরির প্রবৃত্তি'টাও  উধাও হয়ে গেল।
    যাইহোক, সন্ধ‍্যাবেলায় তুলশীতলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা, ঠাকুরঘরে ভগবানের সামনে ধূপ আরতি করা, একাদশীর ব্রত পালন করা, নিয়মিত বিভিন্ন পূজা-পাঠ করা তার সঙ্গে বিভিন্ন পূজা-পাঠের হাজারটা নিয়ম অত‍্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করা (যেগুলো থেকে আমরাও বাদ পরতামনা) , নিজে খাওয়ার আগে সেই খাবার পঞ্চদেবতাকে (নাগ, কূর্ম, দেবদত্ত, ধনঞ্জয়, কৃকরা) নিবেদন করে খাওয়া (পৈতা নেওয়ার পর এই নিয়মটা আমিও কিছুদিন follow করেছিলাম; যদিও কিছু কারণে আর কিছু অকারণে ব‍্যাপারটা continue করে যেতে পারিনি) ইত‍্যাদি এইসবই ঠাকুমার কাছে ছিল ধর্মের পরিভাষা। ঠাকুমা প্রায়ই বলতেন এগুলো ঠিকমতো পালন না করলে ভগবান 'কূপিত' হয়ে 'পাপ' দেবেন (যদিও পরে বুঝেছিলাম একে-ওকে ধরে ধরে পাপ বা অভিশাপ দেওয়া ছাড়াও ঠাকুর বা ভগবানের আরো অনেক গুরুতর কাজ থাকে)। এভাবে ছোটবেলা থেকেই  আমার মধ‍্যে একটা ধারণা গেঁথে গেছিল যে ধর্ম মানে শুধুই চাল-কলা-নৈবেদ‍্য-ধূপ-দীপ-আরতি-ভগবান আর সর্বোপরি ঠাকুরঘর।
    কিন্তু বড় হওয়ার পর যখন মহাভারত পরলাম তখন দেখলাম  'ধর্ম' কথাটা সেখানে শুধু 'ঠাকুরঘরে' আটকে না থেকে নানান জায়গায় নানান অর্থে ব‍্যবহৃত হচ্ছে; এই ধর্মের অর্থ কোথাও সত‍্য, কোথাও কর্ম, কোথাও নীতি, কোথাও আদর্শ, কোথাও  ন‍্যায়, কোথাও বিবেক, কোথাও বুদ্ধি ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি। কথা একটাই কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে তার মানে বা বলা ভাল, ইউসেজ আলাদা রকমের।    
    মহাভারত শেখালো ধর্মের লিমিটেশান কেবলমাত্র ঠাকুরঘর অবধি নয়, মানুষ যা ধারণ করছে সেটাই তার ধর্ম; এরসাথে সবসময় যে 'ঠাকুরঘর' বা ভগবানের সম্পর্ক থাকবেই তার কোন মানে নেই। পিতামহ ভীষ্মও তো হস্তিনাপুরের সিংহাসন আর শাষনব‍্যাবস্থা ম‍্যানেজ করতে গিয়ে  নিজের অনড় প্রতিজ্ঞার পাহাড়ে বারবার ধাক্কা খেয়ে হস্তিনাপুরের অনেক ড‍্যামেজ করে দিয়েছিলেন। হাজার রকম বাধা-বিপত্তি এলেও ভীষ্ম নিজের প্রতীজ্ঞা ভাঙেননি তার প্রতীজ্ঞাই ছিল তার কাছে তার ধর্ম। চারদিক, পৃথিবী আর আকাশকে সাক্ষী রেখে নেওয়া ভীষ্মের সেই প্রতীজ্ঞার সাথে সরাসরিভাবে দেবতাদের কোন সম্পর্ক কিন্তু নেই।
    অর্থাৎ, মহাভারত আমাদের দেখাল যে সত‍্য, নিষ্ঠা, ন‍্যায়, নীতি, আদর্শ ইত্যাদির সাথে বাড়ির কোনের সেই 'ঠাকুরঘর'টাও অবশ‍্যই ধর্ম (যেখানে দেব-দেবী-ভগবানরা চাল-কলা-বাতাশা-সন্দেশ-ধূপ-দীপ-আরতি নিয়ে বিরাজ করেন)। কিন্তু ঠাকুরঘরের সেই ধর্মটাই শুধু ধর্ম আর কোনটা নয়, এমনটা ভাবা ভুল। মহাভারত তো অন্তত তাই বলে।


°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
    মহাভারতে দেখা যায়, পিতামহ ভীষ্ম বালক যুধিষ্ঠিরকে ধর্মের দশটি পরিসর বা ranges সন্মন্ধে বলছেন- ধৈর্য‍্য, সংযম, ক্ষমা, সত‍্য, বুদ্ধি, বিদ‍্যা, চুরি না করা, অন্তরে-বাইরে শুদ্ধ থাকা, ক্রোধশূন‍্যতা এবং ইন্দ্রিয় নিগ্রহ। মহাভারতে 'ধর্ম' কথাটার ব‍্যবহার এত ব‍্যাপকভাবে হয়েছে সেটা কখনো কখনো পাঠকদের কাছে  একটা confusing matter ও হয়ে যায়। একটা ঘটনা ঘটছে আর তাতে কোন চরিত্রের action বা reaction দেখে সাধারণ ভাবে সেটাকে অন‍্যায়-অধর্ম বলেই মনে হচ্ছে কিন্তু সেই ঘটনার অন‍্য চরিত্রটির action বা reaction-এ ঠিক সেটার উল্টোটা দেখা যাচ্ছে।
    মহাভারত থেকেই একটা ঘটনা এর উদাহরন হিসাবে আলোচনা করা যাক। - কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় কর্ণের রথের চাকা মাটিতে বসে যাওয়ার ঘটনাটাতো বহু আলোচিত ও সবার জানা। কর্ণ যখন নিরস্ত্র অবস্থায় রথ থেকে নেমে প্রানপণে চাকাটিকে মাটি থেকে তুলবার চেষ্টা করছেন সেইমুহুর্তে শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশানুসারে অর্জুন তীর চালিয়ে নিরস্ত্র কর্ণকে বধ করলেন; অথচ নিরস্ত্র মানুষের উপর অস্ত্র প্রয়োগ করা তো শাস্ত্রে অধর্ম বলে গণ‍্য হয়। ভগবান হয়েও তাহলে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে অধর্ম করতে বললেন কেন? Well, এর স্বপক্ষে মহাভারতের যুক্তিটা এবার একটু দেখে নেওয়া যাক। - প্রথম থেকেই কর্ণ  হিংসা ও envy-র মনোভাব রেখে অর্জুনের সাথে অধর্ম করেছে; হস্তিনাপুরের রাজসভায় পাঁচ পান্ডব আর দ্রৌপদীকে অপমান করার অধর্ম করেছে, অধর্মের পথে চলা দূর্যোধনকে আজীবন support করে গেছে ), কৌরবদের পক্ষ থেকে যুদ্ধ করার জন‍্য ধর্মের বিরুদ্ধাচরণও করেছে, (অধর্মের উপর কর্ণের indirect supportটা এখানে স্পষ্ট), সম্পর্কে জেঠু হয়েও যুদ্ধে অর্জুনের ছেলে অভিমণ‍্যূকে নৃসংসতার সাথে হত‍্যা করার নিরব সাক্ষী থেকে তাতে মদতও দিয়েছে - কর্ণের অধর্মের লিস্টটা আরো অনেক বড়। এহেন একজন অধর্মীকে বধ না করাটাও শাস্ত্রমতে একটা অধর্ম! উপরন্তু প্রারব্ধ মতে অধর্মীর সাথে অধর্ম করলে সেটা অধর্ম হিসাবে count হয়না বরং ধর্মের রক্ষা করার জন‍্য সেই 'অধর্ম' অবশ‍্য কর্তব‍্য। সুতরাং একটা ব‍্যাপার পরিষ্কার যে অর্জুনকে নিরস্ত্র ও অধর্মী কর্ণকে বধ করতে বলে শ্রীকৃষ্ণ মোটেই কোন অধর্ম বা অন‍‍্যায‍্য কাজ করেননি। কারণ at any cost ধর্মের রক্ষা করাটাই যখন শ্রীকৃষ্ণের main propoganda ছিল। 

    একজন মানুষ নিজের জীবদ্দশায় যা যা কাজ করে তার ফলগুলোও (results) সে তার জীবদ্দশাতেই পেয়ে যায় বা কখনও কখনও মানুষকে পরের জন্মগুলোতেও এই ফল ভোগ করতে হয়। ভালো কাজ করলে ভালো ফল আর খারাপ কাজে খারাপ। একেই কর্মফল বলে যা মানুষের মৃত‍্যুর মতই ইটারনাল- এজলেস একটা সত‍্য। মানুষের কর্ম আর ফলের এই সিস্টেমাটাইজার ব‍্যাপারটিকেই সাধারণভাবে  মানুষের প্রারব্ধ বলে যা ঠিক করে মানুষ তার কোন কর্মটির জন‍্য কিরূপ ফল পাবে। (অনেক ভেবেও প্রারব্ধর কোন লাগসই সহজ বাঙলা পেলামনা; প্রারব্ধ সম্পর্কিত এই আলোচনাটি কিন্তু অতিসংক্ষিপ্ত)
    মহাভারতের এরকম ভুরি ভুরি ঘটনা উদাহরন হিসেবে নিলে দেখা যাবে ধর্মের পরিসর গুলো আদৌ 'confusing' নয়, বরং আপেক্ষিক ('relative')। চিন্তাশীল মানুষ একটু চিন্তা করলেই যা বুঝতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস।
    এই লেখার আগের দিকে ধর্মের যে দশটি range সন্মন্ধে বলা হয়েছিল একসঙ্গে সেগুলোর সবকটি আজকের যুগে কোন মানুষের মধ‍্যে দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। মহাভারতের যুগেও ঠিক এমনটাই ছিল। এমন কোন চরিত্রই সেখানে নেই যার সন্মন্ধে বলা যায় এনার মধ‍্যে ধর্মের সবকটি পরিসর দেখা যায়! এমনকি যুধিষ্ঠিরের কথাও যদি ধরা যায়, হস্তিনাপুরে পাশা খেলে তিনি নিজের প্রারব্ধে সঞ্চয় করা পূণ‍্য কর্ম গুলো ক্ষয় করেছিলেন; পাশা খেলার নেশায় তিনি নিজের সংযম হারিয়ে একে একে নিজের রাজ‍্য, স্বয়ং নিজেকে, নিজের ভাইদের ও last but not least, নিজের স্ত্রীকেও কৌরবদের কাছে হেরেছিলেন।  কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়েও তার নিজের গুরুকে মিথ‍্যে কথা বলাকে সাময়িকভাবে ধর্ম বলে ধরলেও প্রারব্ধ অনুসারে কিন্তু সেটা অধর্মই ছিল। মহাভারতে বলা আছে,  যুধিষ্ঠিরের এই অধর্মের জন‍্যই তার রথের চাকা ভূমি স্পর্শ করেছিল। - যদিও যুধিষ্ঠিরের রথের চাকার ভূমি স্পর্শ করার ব‍্যাপারটা মহাভারতের লেখক/ কবির অতিরঞ্জিত করে লেখা বলেই আমার মনে হয়েছে। রথ নিশ্চই উড়তে পারতনা। হয়ত যুধিষ্ঠির উড্ডীয়মান কোন কিছুতে চড়ে (any helicopter like object) যুদ্ধ করতেন। হয়ত উল্লিখিত অধর্মগুলো করার জন‍্য যুধিষ্ঠিরকে যুদ্ধের ১৮ দিনের মধ‍্যে একদিন রথে চড়ে যুদ্ধ করার 'শাস্তি' পেতে হয়েছিল আর gravitational force অনুযায়ী রথের চাকা যে মাটি ছোঁবেই একথাতো ক্লাস টু-থ্রি পরা একটা শিশুও জানে। (সত‍্য-মিথ‍্যা জানিনা, তবে আমার এমনটাই মনে হয় কারণ aerial vehicle এর একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত মহাভারতে পাওয়া যায়। আর এই ইঙ্গিতটাই আমার মতকে কিছুটা হলেও stand করতে সাহায‍্য করে।....আসলে, বর্ণনা করতে গিয়ে বেদব‍্যাস মহাভারতের কয়েকটি চরিত্রকে তোল্লাই দিয়ে সাধারণের ধরা-ছোঁয়ার একেবারে ওপরে উঠিয়ে দিয়েছেন।)
    যাইহোক আবার ধর্মের আলোচনায় ফিরে আসি, হস্তিনাপুরের মহারাজ পান্ডুও ঋষি কিন্দ‍্যম ও তার স্ত্রীকে ভুলবশত হত‍্যা করে ফেলেছিলেন; নরহত‍্যার এই গ্লানি তাকে তার মনের অন্তরে-বাইরে শান্তি দেয়নি। মহারানী কুন্তীও তার কুমারি অবস্থায় মা হওয়ার সত‍্য প্রায় আজীবন লুকিয়ে এসেছিলেন অর্থাৎ সত‍্য লুকিয়েছিলেন। ধৃতরাষ্ট্রের মধ‍্যেও ধৈর্য্য, ক্ষমা, সংযত থাকা ইত‍্যাদি এইসব ধর্ম পরিসর ছিলনা।
    ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা ছিল সারাজীবন অবিবাহিত থাকা ও আমৃত‍্যু তার রাজ‍্যের রাজসিংহাসন ও মহারাজের সেবা করে যাওয়া। ভীষ্ম নিজের প্রতিজ্ঞাকে নিজের পরম ধর্ম বলে মানতেন যার জন‍্য বেঁচে থাকতে তিনি কখনই নিজের এই প্রতিজ্ঞা থেকে সরে আসেননি। এই প্রতিজ্ঞার কাছে কমিটমেন্টের জন‍্যই তার শেষ অবধি তাকে অনিচ্ছাকৃতভাবে ধর্মের বিরুদ্ধেই লড়তে হয়েছিল।
   দ্রোণাচার্য‍্য ছিলেন কৌরব রাজবংশের অস্ত্রগুরু। যে কোন পরিস্থিতিতে হস্তিনাপুর রাজসিংহাসনের  ডিফেন্সের জন‍্য হস্তিনাপুরের হয়ে লড়াই করতে তিনিও এক প্রকার বাধ্যই ছিলেন । তাই পিতামহ ভীষ্মের মত তাকেও নিজের অনিচ্ছাসত্বে ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে অধর্মের সঙ্গ দিতে হয়েছিল। দ্রোণাচার্য‍্য পুত্র অশ্বত্থামার ছোট থেকেই অভিযোগ ছিল দ্রোণাচার্য‍্য তার থেকে বেশী অর্জুনকে ধনুর্বিদ‍্যা শেখাতে আগ্রহী ছিলেন। তাই খুব obvious ভাবেই তার মনে অর্জুন ও বাকি পান্ডবদের সন্মন্ধে রাগ জন্মায় আর খুব স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধে তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে দূর্যোধনের দলে সে নাম লিখিয়েছিল।
    কর্ণও অস্ত্রিশক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন‍্য পরশুরামকে নিজের মিথ‍্যা পরিচয় দিয়েছিলেন। অর্জুনের উপর রাগতো তার শুরুর থেকেই ছিল আর ছিল দূর্যোধনের প্রতি তার 'মিত্র বাৎসল‍্যতা'; এই 'commitment' এর জন‍্যই দূর্যোধনের সঙ্গে অধর্মের পথে চলতে কর্ণ পিছুপা হয়নি। 'মিত্র বাৎসল‍্যতা'কেই নিজের ধর্ম হিসেবে মেনে নিয়ে মহাভারতে কর্ণ তার পথ চলেছিল।  হস্তিনাপুর রাজসভায় দ্রৌপদীকে অপমান করে কর্ণ স্বয়ম্বর সভায় দ্রৌপদীর তাকে করা অপমানটার ঝালতো মিটিয়ে নিয়েছিল কিন্তু সেইসঙ্গে ধর্মের বেশ কয়েকটি পরিসর হারিয়েওছিল তার চারিত্রিক দিক থেকে। সত‍্য, সংযম, ক্রোধশূন‍্যতা- ধর্মের এই কয়টি পরিসর কর্ণের মধ‍্যে দেখা যায়না।
    যুধিষ্ঠির ছাড়া বাকি চার পান্ডবদের চরিত্রের মধ‍্যেও ধর্মের দশটি পরিসরের দশটিই হাজির ছিলনা। রাগ তাদের সকলের মধ‍্যেই ছিল। বিশেষত হস্তিনাপুরের রাজসভায় পাশা খেলার সময় দ্রৌপদীকে বাজি রাখার 'যৌধিষ্ঠিরিয় বাড়াবাড়ি' তে ভীমসেন ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে যুধিষ্ঠিরকে বলেছিল 'আপনি যদি আমার বড়ভাই না হতেন তাহলে পাঞ্চালিকে বাজি রাখার শাস্তি  আমি আপনাকে অবশ‍্যই দিতাম।' ঐ সভাতেই দ্রৌপদীকে অপমানূচক কথা বলার পর কর্ণের উপরে অর্জুনও তার মেজাজ হারিয়েছিলেন। নিজের সুপুরুষ চেহারার উপর নকুলের ও নিজের বিদ‍্যার উপর সহদেবের অহংকার তাদের চরিত্রকে ধর্মের রেঞ্জের সবকটি দিয়ে পূরণ হতে দেয়নি।
    অন‍্যদিকে, কৌরব ভাইদের মধ‍্যে এক বিকর্ণ ছাড়া আর কারো ম‍ধ‍্যেই ধর্মের কোন পরিসরই ছিলনা। (তাই বলে বিকর্ণের মধ‍্যেও যে সব ধর্ম পরিসরগুলো ছিল তা কিন্তু নয়; কিন্তু দূর্যোধনের করা অন‍্যায়-অধর্ম গুলোর বেশ কিছুর প্রতিবাদ কৌরবদের মধ‍্যে একমাত্র বিকর্ণকেই করতে দেখা গিয়েছিল মহাভারতে।)
    মহাভারতের যুদ্ধ চলাকালীন খোদ শ্রীকৃষ্ণ নিজেও একবার পিতামহ ভীষ্মের উপর মেজাজ। হারিয়ে তাকে আক্রমণ করতে গিয়েছিলেন।
    কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ চলাকালীন পিতামহ ভীষ্মের উপর, এই যুদ্ধেরই শেষ লগ্নে এসে অশ্বত্থামার উপর আর ওই যুদ্ধের বেশকিছু বছর পর যাদবদের উপরে ছাড়া মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণকে সেভাবে আর কোথাও রাগতে দেখা যায়না। শ্রীকৃষ্ণের মধ‍্যে এই রাগ গুলি দেখিয়ে বেদব‍্যাস কি তাঁকে 'মনুষ‍্যত্ব' দিতে চেয়েছিলেন? কারণ, ভগবান বিষ্ণুকে তো সচরাচর  এত রাগ করতে দেখা যায়না।.... হয়ত তাই - বেদব‍্যাস শ্ররীকৃষ্ণকে 'মনুষ‍্যত্ব'ই দিতে চেয়েছিলেন; অতি উঁচুদরের বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন একজন মানুষকে দেখাতে চেয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণের মাধ‍্যমে। (....একটা ব‍্যাপারতো স্পষ্ট, যে আমরা যা দেখেছি-বুঝেছি ব‍্যাসদেব মোটেও তা দেখাতে বা বোঝাতে চাননি।)
    সুতরাং দেখা যাচ্ছে ধর্মের বাকি পরিসরগুলো সবার মধ‍্যে দেখা গেলেও 'সত‍্য' ও 'ক্রোধশূন‍্যতা' সবার চরিত্রে ছিলনা।
    মহাভারতের এইরকম কিছু superstar - megastar দের দিকে তাকালে বোঝা যায় যে তারা তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধর্ম হিসাবে মেনে সবার আগে স্থান দিয়েছিলেন, তাদের কাছে ধর্মের অর্থ 'religion' এর অনেক আগে তাদের 'characteristics' ছিল। অর্থাৎ মহাভারতের যুগে প্রত‍্যেকটি চরিত্রের পালিত ধর্ম পরস্পর থেকে আলাদা ছিল। সেইজন‍্য কোথাও কোথও প্রচন্ড আপেক্ষিক ছিল এই ধর্ম। ফলস্বরূপ মহাভারতে 'ধর্ম' জিনিসটা বড়ই confusing বলে মনে হয়েছে।
   
    অতএব, আমরা আমাদের ধর্মস্থান-মন্দির মার্কা 'সংকুচিত' ধর্মের নিরিখে যদি মহাভারতের সুপ্রসারিত ধর্মকে দেখতে যাই তাহলে এইরকম confusion হওয়াটাই স্বাভাবিক।
    কিন্তু ঘটনা হল, মহাভারত পরবর্তী বেশ অনেক বছর ধরেই সমাজের তথাকথিত মোড়লেরা ধর্মের সম্পর্কে আমাদের শুধু ভুলই বুঝিয়ে গেছে যার জন‍্য আজকের যুগে ধর্ম বলতে আমরা শুধু ভগবান-দেবতা-ঠাকুরঘর এসবই বুঝি। ঠাকুরঘর বা মন্দির -ধর্মস্থানের বাইরে এই ধর্মকে নিয়ে আসার কোন 'সাহস'ই আমরা আজকের যুগে তাই আর পাইনা বা দেখাইনা।
    আমাদের দেশে মহাকাব্য নিয়মিত পড়েন ভক্তজন, আর চর্চা করেন গবেষকরা। সাধারণ মানুষ যদি মহাভারতকে গল্প হিসেবেও  পড়ার অভ্যাস রাখত, ধীরে ধীরে বুঝতে পারত ধর্মের অরিজিনালিটি আর ডুপ্লিকেসির মধ্যে ফারাক টা কী।
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার বলেছিলেন, 'আমরা বিদ‍্যাকে নিজেদের বাহন করার পরিবর্তে বহন করে চলেছি।' ধর্মের ব‍্যাপারেও কিন্তু একই কথা প্রযোজ‍্য। শুনতে হাস‍্যকর হলেও এ কথা ঠিক যে ধর্মকেও আমরা বাহন করার বদলে বহন করে চলেছি। কোথায় আমরা ধর্মকে নিজের ইচ্ছায় চালাবো তা না, তার বদলে ধর্মই আমাদের ইচ্ছামত দৌড় করাচ্ছে! অ‍্যাকচুয়ালি, যেই ধর্ম আমাদের মুক্তি দেওয়ার জন‍্য মুখিয়ে আছে, কিছু নির্বোধ সমাজপতিদের দৌলতে সেই ধর্মের হাতেই আজ আমরা বন্দী।

-© দেবাংশু গোস্বামী

Monday, July 6, 2020

Quite honesty about Mahabharata :


 বাংলায় 'পরের ধনে পোদ্দারি' বলে একটা কথা আছে। নিজের মালিকানা বা অধিকার না থাকা সত্বেও কোন ব‍্যাক্তি যখন অন‍্যের কোন সম্পত্তির উপর জোর খাটায় তখন এই কথাটা ব‍্যবহার করা হয়। মহাভারতে বর্ণিত হস্তিনাপুর-কুরুক্ষেত্র এসব নিয়ে তথাকথিত কৌরব-পান্ডবদের বাড়াবাড়িটাও আমার কেন জানো 'পরের ধনে পোদ্দারি' বলেই মনে হয়! এরকম মনে হওয়াটা হঠাৎ করে আমার মাথায় আসেনি, এরকম মনে করার উপযুক্ত কারণ আছে বলেই এমনটা মনে হয়েছে; আর মজার কথা, সেই কারণটা মহাভারতেই বলা আছে। ব‍্যাপারটা একটু বেশী ইজি বলেই হয়ত এতদিন সেভাবে এটা আমাদের চোখে পড়েনি বা হয়ত পাছে মহাভারতের অমর্যাদা হয়ে যায় সেই ভয়ে কেউ কেউ ব‍্যাপারটা বোঝা সত্বেও এ নিয়ে কোন আলোচনা করেনি। এর মধ‍্যে দ্বিতীয় কারণটাই বেশী অ‍্যাক্সেপ্টেবল বলে আমার মনে হয়, কারণ যতজন মানুষ আজ পর্যন্ত মহাভারত পড়েছেন তাদের মধ‍্যে জ্ঞানী ও বিদগ্ধ মানুষও নিশ্চয়ই আছেন; আর তাঁরা এই ব‍্যাপারটি বুঝবেন না এটা আমার ঠিক বিশ্বাস হয়না। 

তবে কিছু বলার আগে আমি দু-একটা কথা বলে নিতে চাই,   মহাভারত ও তার চরিত্রগুলোকে এবং তাদের রচয়িতা হিসেবে ব‍্যাসদেবকে আমি খুবই শ্রদ্ধা করি এবং এই লেখার মাধ্যমে কোনভাবেই তাদের অসম্মান বা অনাদর করছি না। সেই যোগ‍্যতাই আমার নেই। আমার যেটুকু মনে হয়েছে আমি সেই কথাই লিখছি। এমনকি, আমার এই লেখার উদ্দেশ্য কোনমতেই নর বা নারী জাতিকে ছোট করা বা সমাজের বিভিন্ন নিয়ম-প্রথার বিরোধিতা করাও নয়।

ব‍্যাপারটাকে আর বেশী না ফেনিয়ে আমরা এক কাজ করি, মহারাজ শান্তনুর থেকে কুরু বংশের ফ‍্যামিলি ট্রি টা একবার দেখে নেই।- 
 মহাভারত বলেছে, শান্তনু ও গঙ্গার পুত্রের নাম দেবব্রত (দেবব্রত আজীবন ব্রহ্মচারী ছিলেন, বিয়ে-থা করেননি); শান্তনু ও সত‍্যবতীর দুই পুত্র চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য (এর মধ‍্যে চিত্রাঙ্গদ অল্প বয়সেই মারা যায়)। কাশীর দুই রাজকুমারী অম্বিকা আর অম্বালিকার সাথে বিচিত্রবীর্যের বিয়ে তো হয়েছিল কিন্ত কোন সন্তান জন্মাবার আগেই তিনিও   যমলোকে পৌঁছে যান। আমাদের দেশে প্রাচীনকাল থেকেই যেটা হয়ে আসছে-'পিতার পরিচয়ই পুত্রের পরিচয়'- এর অনুসারে এখানে এটা বলা খুব ভুল হবেনা যে বিচিত্রবীর্যের মৃত‍্যুর সাথেসাথেই হস্তিনাপুরের রাজবংশও (কুরু বংশ) শেষ হয়ে গেছিল! তাহলে হস্তিনাপুর রাজবংশে বিচিত্রবীর্য  পরবর্তী সময়ে যেই জেনারেশনগুলো এসেছিল, সায়েন্টিফিক‍্যালি তাদেরকে ঠিক 'কুরুবংশ জাত' বলা যাচ্ছেনা।

    তাহলে ধৃতরাষ্ট্র বা পান্ডু এরা কারা? মহাভারত পড়ে আমরা জানতে পারি, বিচিত্রবীর্যের মৃত‍্যুর পর রাজমাতা সত‍্যবতীর ইচ্ছায় ব‍্যাসদেব স্বয়ং বিচিত্রবীর্যের দুই বিধবা পত্নী অম্বিকা ও অম্বালিকা এবং অম্বিকার প্রধান দাসী শূদ্রীকে নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ‍্যমে তিনটি সন্তান প্রদান করেন। জন্ম নেয় যথাক্রমে, ধৃতরাষ্ট্র, পান্ডু ও বিদুর। অর্থাৎ ধৃতরাষ্ট্র বা পান্ডু কেউই কিন্তু বিচিত্রবীর্যের ঔরসজাত সন্তান (লেজিটিমেট চাইল্ড) নন। (তবে কি তারা ব‍্যাসদেবের ঔরসজাত?) এখানে খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রশ্ন উঠতেই পারে, কিভাবে তাহলে তারা কুরু বংশধর হচ্ছেন? এক যদিনা তারা কুরুবংশের দুই কুলবধু হিসাবে পরিচয় পাওয়া অম্বিকা ও অম্বালিকার পরিচয় পেয়ে থাকেন। তবে আমরা জানি এই পৃথিবীতে, বিশেষত আমাদের দেশে বাবার পরিচয়েই ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে ওঠে, মায়ের পরিচয়ে নয়। কারণ বিয়ের পরে তার স্বামীর পরিচয়ই যেকোন মেয়ের পরিচয় হয়ে যায়। 

  'নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিচিত্রবীর্যের দুই রাণীর গর্ভে সন্তান প্রদান করলে সেই সন্তান পরবর্তীকালে বিচিত্রবীর্য পুত্র ও কুরু কুলজাত বলেই সমাজে খ‍্যাতিলাভ করবে'- ব‍্যাসদেবের অন‍্যান‍্য কথা বিশ্বাসযোগ্য হলেও এই কথাটা যাকে বলে, 'ইয়ে বাত কুছ হজম নহি হুই!'  ভারতীয় সমাজবিধি অনুসারে নবজাতকদের বংশের পরিচয় সম্পূর্ণভাবে ডিপেন্ড করে জনকের পরিচয়ের উপর; আর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যেখানে আসল জনকের জায়ঘায় অন‍্য কোন 'জনক' 'প্রক্সি' দিয়ে থাকে সেখানে কিভাবে নবজাতকের বংশপরিচয় আসল জনককে দিয়ে ডিফাইন করা যায়, অনেক ভেবেও এর কোন কুলকিনারা পেলামনা। নিয়োগ প্রক্রিয়া সন্মন্ধে মহাভারতে যতটা জানা যায় তাতে করে তো মনেহয় এটা একধরনের সারোগেসি ছাড়া আর কিছুই না। অর্থাৎ একথা বলাও খুব ভুল হবেনা যে, ব‍্যাসদেব ধৃতরাষ্ট্র ও পান্ডুর সারোগেট ফাদার (বা এই ধরনেরই কিছু একটা) ছিলেন যার সাথে কুরু বংশের কোনরকম রক্তের সম্পর্ক ছিলনা। (এখানে বলে রাখি, ব‍্যাসদেব সত‍্যবতী ও মহামুনি পরাশরের ছেলে ছিলেন। সত‍্যবতীর কুমারী অবস্থার পুত্র।)..মহাভারতে তাই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধৃতরাষ্ট্র বা পান্ডু জন্মাবার পরেও সত‍্যবতীকে হস্তিনাপুরের 'দূর্ভাগ‍্য'-র কথা বলে কাঁদতে দেখা গেছিল। শুধুমাত্র ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধত্বই সত‍্যবতীর বলা সেই 'হস্তিনাপুরের দূর্ভাগ‍্য' হতে পারেনা কারণ ধৃতরাষ্ট্রকে হস্তিনাপুরের রাজা করতে না পারলেও রাজমাতা সত‍্যবতীর কাছে কিন্তু হস্তিনাপুরের (কুরু বংশের) রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী নিয়ে পান্ডুর রূপে একটা অপশন ছিলই। সত‍্যবতীর সেদিনের কান্নার কারণ গুলো হতে পারে-
১. বিচিত্রবীর্যের অকাল মৃত‍্যু।
২. আজীবন ব্রহ্মচর্য ব্রতর প্রতিজ্ঞায় বাঁধা থাকার জন‍্য সত‍্যবতী ও নিষাদ রাজের কথায় অম্বিকা ও অম্বালিকাকে বিয়ে করতে দেবব্রতর অস্বীকার করা।
৩. ফলে বিচিত্রবীর্যের মৃত‍্যুর পরই কুরুবংশ লোপ পেয়ে যাওয়া।
৪. লোকসমাজের 'ভয়ে' তিন নবজাতকদের ব‍্যাসদেব পুত্র বলে পরিচয় দিতে না পারা।
৫. অম্বিকার গর্ভজাত ধৃতরাষ্ট্রের জন্মান্ধতা।
৬. সর্বোপরি, রাজমাতা হিসেবে হস্তিনাপুরের ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তা।

  উপরে বলা ২ নম্বর কারণটা নিয়ে একটু ভাবলেই এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পরে একমাত্র দেবব্রতই পারতেন কুরু বংশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে কিন্তু সত‍্যবতীর পিতার কাছে তিনি  আজীবন ব্রহ্মচারী থাকার প্রতীজ্ঞা করে রাখার জন‍্য তা করেননি। (যদিও বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পরে সত‍্যবতীর পিতা দেবব্রতকে কথা ফিরিয়ে দিয়ে প্রতীজ্ঞাটি উইথড্র করে নিতে বলেছিল কিন্তু দেবব্রত তাতেও রাজী হননি।)

  আবার, ভুল করে কিন্দ‍্যম ঋষিকে সস্ত্রীক হত‍্যা করে ফেলার অপরাধে পান্ডু ঋষির কাছ থেকে অভিশাপ পেয়েছিলেন যে পান্ডু যখনই নিজের স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ হবেন ঠিক তখনই পান্ডু ও তার স্ত্রীর মৃত‍্যু ঘটবে। 

   ওদিকে কুমারী থাকাকালীন কুন্তী দূর্বাশা মুনির কাছ থেকে একটি আশীর্বাদ পেয়েছিল; আশীর্বাদটি ছিল, বিশেষ একটি মন্ত্র পাঠ করে কুন্তী যদি কোন দেবতাকে স্মরণ করে তাহলে সেই দেবতা কুন্তীকে দেখা দেবেন ও তাঁর প্রসাদ হিসেবে একটি পুত্র সন্তান কুন্তীকে দান করে যাবেন। পান্ডুর অভিশাপের ঘটনাটা কুন্তী যখন জানতে পারলেন তখন তিনি সন্তান লাভের জন‍্য দূর্বাশা মুনির কাছ থেকে পাওয়া এই আশীর্বাদটি কাজে লাগালেন ও এক এক করে ধর্মদেবতার থেকে যুধিষ্ঠির, পবন দেবতার থেকে ভীমসেন, স্বয়ং ইন্দ্রদেবের থেকে অর্জুন ও দুই অশ্বিনীকুমারের থেকে নকুল ও সহদেব নামের দুই জমজ ছেলেদের লাভ করলেন। যেই ছেলেরা পরবর্তীতে পান্ডুপুত্র পরিচয়ে খ‍্যাতিলাভ করল। কিন্তু মজার কথা, এই 'পান্ডুপুত্র'রা কেউই পান্ডুর ঔরসজাত তো নয়ই, এমনকি কুন্তী বা মাদ্রী কারোরই গর্ভজাতও নয় (এর বেশী আর ভাঙলামনা)! অর্থাৎ হস্তিনাপুরের কুরুবংশের সাথে এরা কোনভাবেই রিলেটেড নয়। এবারে হয়ত পান্ডুপুত্রদের জন্ম দেওয়ার জন‍্য উক্ত দেবতাদের সারোগেসি বা টেস্ট টিউব বেবি পদ্ধতি গুলোর চেয়েও উন্নত কোন পদ্ধতি অ‍্যাপ্লাই করতে হয়েছিল।

  একই কথা খাটে কৌরবদের বেলাতেও। তবে এবার প্রথমে ধৃতরাষ্ট্রের মারফত গান্ধারী গর্ভবতী হয়েছিল ; গান্ধারী তখন হস্তিনাপুরের মহারানি।  মহারানি গর্ভবতী আর সেকারনে গোটা নগরীতে আনন্দের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একে একে দশ মাস, এক বছর, দুই বছর কেটে গেলেও ধৃতরাষ্ট্রের ঘরে কোন বাচ্চার কান্না শোনা গেলনা। দুই বছর পর গান্ধারী তার গর্ভ থেকে বড়সড় একটি মাংসপিন্ড প্রসব করল। সেই মুহুর্তে হস্তিনাপুরে আবার ব‍্যাসদেব এলেন ও গান্ধারীর প্রসব করা সেই মাংসপিন্ড একশ ভাগে ভাগ করে প্রত‍্যেকটা ভাগকে  আলাদা আলাদা কলসীতে ভরে রাখলেন আর সেখান থেকে জন্ম নিল দূর্যোধন, দুঃশাষন, বিকর্ণ প্রভৃতি কৌরবেরা। কৌরবদের এই জন্মবৃত্তান্ত সত‍্যিই রহস‍্যজনক। এখানেও ব‍্যাসদেব হয়ত আবার সারোগেসির পথে হেঁটেছিলেন অথবা টেস্ট টিউব বেবি পদ্ধতিটির কোন জটিল ভার্সনের সাহায‍্য নিয়েছিলেন। এই দুইয়ের যেটাই তিনি করে থাকুননা কেন, সদ‍্য জন্ম নেওয়া কৌরবরাও যে ধৃতরাষ্ট্রের ঔরস জাত সন্তান ছিলনা এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবেই বোঝা যায়।

  তাহলে যা দেখা গেল, ধৃতরাষ্ট্র ব পান্ডু বিচিত্রবীর্যর ঔরসজাত নয়, পান্ডবেরা পান্ডুর ঔরসজাত নয়,  কৌরবরা ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসজাত নয়; এমনকি  হস্তিনাপুর-ইন্দ্রপ্রস্থ এসবের সঙ্গে এদের প্রত‍্যক্ষ কোন সম্পর্কও নেই; তবুও সারা মহাভারত জুড়ে এদের অ‍্যাক্টিভিটি কিন্তু  হস্তিনাপুর-ইন্দ্রপ্রস্থ রাজ‍্য ওরিয়েন্টেড। মহাভারতের শেষ লগ্নে এরা হস্তিনাপুরের সিংহাসনের জন‍্য বা ইন্দ্রপ্রস্থের জমির জন‍্য ভয়াবহ এক মহাযুদ্ধ করতেও পিছুপা হয়নি। যদি এমনটা ধরে নেই যে, বিচিত্রবীর্যের মৃত‍্যুর পরই কুরুবংশ শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাহলে দেখা যাবে ধৃতরাষ্ট্র থেকে নিয়ে সহদেব পর্যন্ত এরা কেউই কুরুবংশের প্রতিনিধি ছিলনা আর তাই কুরুবংশ শাষিত কোন অঞ্চলেই এদের কোনপ্রকার অধিকার থাকারও কোন প্রশ্ন নেই! কিন্তু তাও এদেরকে আমরা সেইসব স্থানগুলোতে নিজেদের অধিকার মানতে দেখি মহাভারতে এবং শেষমেশ এইসব স্থানসমূহে নিজেদের অধিকারের দাবী নিয়ে কুরুক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মধ‍্যে যুদ্ধও করতে দেখি। এর জন‍্যই লেখাটার শুরুর দিকে 'পরের ধনে পোদ্দারি' কথাটার ব‍্যবহার করেছিলাম।

এটা তো দেখলাম একটা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে; এবার অন‍্য একটা দৃষ্টিকোণ থেকে ব‍্যাপারটা দেখি। ধৃতরাষ্ট্র, পান্ডু, পঞ্চপান্ডব বা শত কৌরব- এদের কারো কারো জন্মের আগেই তাদের পিতা গত হয়েছেন আবার কারো কারো জন্মগ্রহনে তাদের পিতার কোন কার্যকারি ভূমিকা ছিলনা তা সত্বেও তারা তাদের পিতার বংশপরিচয়ে পরিচিত হচ্ছে। এখানে যদি ধরেও নেই এই পরিচয়টা আসছে তাদের মায়েদের পরিচয় থেকে (এ কথা বলার কারণ মহাভারতের একাধিক জায়গায় বিভিন্ন চরিত্রদের তাদের মায়ের পরিচয়ে ডাকা হয়েছে, যেমন কর্ণকে রাধেয়, যুধিষ্ঠির-ভীম-অর্জুনকে কুন্তীপুত্র, শ্রীকৃষ্ণকে দেবকী নন্দন ইত‍্যাদি)। তাহলে একথা স্বীকার করতেই হবে যে, সেই মহাভারতের যুগে নারীদের স্থান সত‍্যি সত‍্যিই সমাজে অনেক উঁচুতে ছিল; পুরুষদের সমান অধিকার নারীদেরও ছিল আবার ক্ষেত্রবিশেষে নারীদের অধিকার পুরুষদেরও উপরে ছিল। অর্থাৎ, সেই যুগে সমাজটা আজকের মত পুরুষ শাষিত ছিলনা; কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীরাও সমাজ শাষণ করতন। (অন্তত আমার  তাই মনে হয়; তাছাড়াও মহাভারতকে আমার  শুধু পুরুষ শাষিত একটা সমাজের কাব‍্য বলে মনে হয়নি কোনদিন।) পরবর্তীকালে সমাজব্যবস্থায় কোন পরিবর্তন চলে আসার ফলে নারী শাষনের ব‍্যাপারটা উঠে যায়।

 মহাভারতের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত এই বিষয়গুলো ধোঁয়ায় ঢাকা ও যথেষ্ট রহস‍্যজনক। মহাভারতের ঘটনাগুলোকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সেগুলোর বিভিন্ন অর্থ দাড় করানো যায়। সেরকমই একটা দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করে আমার  যা মনে হয়েছে, ওপরে আমি সেটাই লিখলাম। আসলে মহাভারতের রচয়িতা ব‍্যাসদেব ঘটনাগুলোতে কিছুটা অতিপ্রাকৃত-আধিদৈবিক টাচ দিয়ে লিখে গেছেন আর এমনই তাঁর লেখার ভঙ্গি যে যখনই যেই ব‍্যাক্তিই ঘটনাগুলো আগ্রহ নিয়ে পড়বে, সেগুলো নিয়ে সেই ব‍্যাক্তি ভাবতে বাধ‍্য হয়ে যাবে।  উপরের লেখাটায় আমার চিন্তা-ভাবনার আরো কয়েকটি অ‍্যাঙ্গেল লেখা যেত কিন্তু সেগুলোর সবটা লেখার সাহস করে উঠতে পারলামনা কারণ সেগুলো হয়ত মহাভারতের ইতিহাসটাকে কিছুটা হলেও বিকৃত করে দিয়ে বিতর্ক বাড়িয়ে তুলতে পারত। যতটুকু লিখলে সেই বিতর্ক এড়ানো যায় ততটুকুই লিখলাম। তাও এতটুকুতেও হয়ত কিছুটা হলেও তর্কাতর্কির হাওয়া উঠতেই পারে।

  সব শেষে এটাই বলব যে, মহাভারত বা তার ঘটনাসমূহ বা তার চরিত্র বা মহাভারতের লেখক  এদের কাউকেই অমর্যাদা করা কোনভাবেই আমার উদ্দেশ্য নয়। 

© দেবাংশু গোস্বামী